খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় একটি বিয়েবাড়ির উৎসবের ব্যস্ততার সুযোগে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই সহোদরা বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) বিকেলে উপজেলার বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়নের পাবই গ্রামে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত দুই শিশু হলো—পাবই গ্রামের হ্যান্ডট্রলি চালক নিজাম উদ্দিনের বড় মেয়ে নিহা আক্তার (৭) এবং ছোট মেয়ে নোহা আক্তার (৩)। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই দুই কন্যাশিশু ছাড়া নিজাম উদ্দিনের আর কোনো সন্তান নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার নিজাম উদ্দিনের ভাতিজির বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। বিয়েবাড়ির বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা ও রান্নাবান্নাসহ অন্যান্য কাজে পরিবারের সব সদস্য অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। এই ব্যস্ততার সুযোগে দুপুরের দিকে দুই বোন বাড়ির সামনের পুকুরে গোসল করতে যায়। গোসলের একপর্যায়ে সাঁতার না জানা দুই শিশুই পুকুরের গভীর পানিতে তলিয়ে যায়।
বিকেলের দিকে স্থানীয় এক বাসিন্দা পুকুরের পানিতে একটি শিশুকে ভেসে থাকতে দেখে চিৎকার শুরু করেন। তাঁর চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পুকুর থেকে দুই শিশুকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। উদ্ধার করার পরপরই তাদের দ্রুত মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুই শিশুকেই মৃত ঘোষণা করেন।
মোহনগঞ্জ চিলড্রেন ড্রাউনিং বা শিশু মৃত্যুর এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। মোহনগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী এই ধরনের অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করার কথা থাকলেও, তারা পুলিশকে বিষয়টি জানায়নি।
এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমেনুল ইসলাম চিকিৎসকদের অবহেলার কথা স্বীকার করে বলেন, “অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে পুলিশকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অবহিত করার জন্য আমি নিজে একাধিকবার মিটিং করে চিকিৎসকসহ সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কর্তব্যরতরা সেই কথা আমলে নেয়নি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জানান, এমন সংবেদনশীল ঘটনায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পুলিশকে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি ও আইনি বাধ্যবাধকতা। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের এই অবহেলার বিষয়টি ইতিমধ্যেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন যে তিনি এই বিষয়ে যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| দুর্ঘটনার বিবরণ ও খাত | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য |
| দুর্ঘটনার স্থান | পাবই গ্রাম, বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়ন, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা |
| দুর্ঘটনার তারিখ ও সময় | ১৯ জুন, ২০২৬ (শুক্রবার) দুপুর থেকে বিকেল |
| নিহতদের পরিচয় | নিহা আক্তার (৭) ও নোহা আক্তার (৩) [পরস্পর সহোদরা বোন] |
| পিতার নাম ও পেশা | নিজাম উদ্দিন, হ্যান্ডট্রলি চালক |
| ঘটনার প্রেক্ষাপট | নিজাম উদ্দিনের ভাতিজির বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবারের সবার ব্যস্ততা |
| উদ্ধার ও চিকিৎসা | স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার ও মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ |
| আইনি জটিলতা | হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পুলিশকে অবহিত না করার অভিযোগ |
পরিবারে একমাত্র দুই সন্তানকে হারিয়ে হ্যান্ডট্রলি চালক নিজাম উদ্দিনের পরিবারে বর্তমানে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।