বিশ্বজুড়ে ডিজেল সরবরাহে সংকট, চাপ থাকতে পারে ২০২৭ সালেও

বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহের সংকট দ্রুত কাটার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে ডিজেলের বৈশ্বিক বাজার ক্রমেই চাপে পড়ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতির প্রভাব ২০২৭ সালেও গড়াতে পারে। খবর রয়টার্সের।

ডিজেলের সংকটের মূল কারণ শুধু অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়া নয়; বরং জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য—দুই গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকেই ডিজেল সরবরাহ কমেছে। রয়টার্সের হিসাবে, আগস্টে রাশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিট ডিজেল রপ্তানি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল কম ছিল। বিশ্বের সমুদ্রপথে ডিজেল বাণিজ্যের বড় একটি অংশ আসে এই দুই অঞ্চল থেকে।

মজুত দ্রুত কমছে

সরবরাহ কমার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ডিজেলের মজুতও দ্রুত নেমে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজেলের মজুত কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা বছরের এই সময়ের হিসাবে ১৯৮২ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের বড় একটি অংশজুড়েও মজুত পাঁচ বছরের গড়ের নিচে থাকতে পারে।

ইউরোপের আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প (এআরএ) অঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। জুলাইয়ে সেখানে ডিজেলসহ ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম ছিল। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যকেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও সাম্প্রতিক সময়ে ডিস্টিলেটের মজুত ২০২৫ সালের গড়ের নিচে রয়েছে।

মজুত কমে যাওয়ার আরেকটি অস্বাভাবিক প্রভাব পড়েছে সংরক্ষণ অবকাঠামোর বাজারে। উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডিজেল সংরক্ষণের জন্য ভাড়া দেওয়া ট্যাংকের সক্ষমতা অক্টোবরের জন্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে উঠেছে, যা জুনে ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল। স্টোরেজ ব্রোকার প্রতিষ্ঠান দ্য ট্যাংক টাইগারের তথ্য অনুযায়ী, এর একটি কারণ হলো কিছু শোধনাগার ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পুরোনো স্টোরেজ লিজ নবায়ন করছে না—কারণ ট্যাংকে রাখার মতো পর্যাপ্ত ডিজেলই তাদের হাতে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ছয় ডলার ছাড়িয়েছে

সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি মাসে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। প্রায় ৩ দশমিক ৭৮৫ লিটারের এক গ্যালন ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষক, ট্রাকচালক ও পরিবহন ব্যবসার ওপর সরাসরি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব অনেক। দেশটিতে ডিজেলের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে ট্রাক, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য পরিবহন পরিচালনার ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি খরচ পরে পণ্য পরিবহন, কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, শোধনাগার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। উচ্চ পরিশোধন মুনাফা থাকলেও দ্রুত নতুন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সময় লাগতে পারে।

কৃষি, শিল্প ও পরিবহনে বাড়ছে ঝুঁকি

ডিজেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়। কৃষি যন্ত্রপাতি, ট্রাক, ট্রেন, জাহাজ, খনি ও শিল্পকারখানার বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেল চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশের সঙ্গে ডিজেলের সম্পর্ক রয়েছে বলে রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব জ্বালানি বাজার ছাড়িয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়তে পারে এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়তে পারে।

২০২৭ সালেও সংকটের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। চীন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেল পরিশোধনের উচ্চ মুনাফা শোধনাগারগুলোকে উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। এসব পদক্ষেপ সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা কমাতে সক্ষম হতে পারে।

তবে বিপরীত দিকের ঝুঁকিও রয়েছে। ইরান বা রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত আরও তীব্র হলে, কিংবা বড় কোনো শোধনাগারে আকস্মিক উৎপাদন বন্ধ হলে ডিজেলের দাম আবার দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ কমতে পারে। একই সময়ে সংঘাত ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার কারণে পরিশোধিত জ্বালানির মজুত দ্রুত কমছে। সংস্থাটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত হলে বাজারে চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ডিজেল বাজারের বর্তমান সংকটকে সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে সরবরাহ ঘাটতি, কম মজুত এবং সীমিত পরিশোধন সক্ষমতার সম্মিলিত প্রভাব আগামী বছরও জ্বালানি বাজারে চাপ ধরে রাখতে পারে। এর সঙ্গে বাড়তে পারে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয়—যার পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।