খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (নন-পারফর্মিং লোন–এনপিএল) পরিমাণ এখন এক চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পর বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক ঋণ শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার এই গুরুতর অবক্ষয়ের চিত্রটি এখন আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার এখন সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান খেলাপি ঋণের তুলনায় বাংলাদেশের এই হার প্রায় ৬ থেকে ১৫ গুণ বেশি, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর উপায় নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ প্রশিক্ষণ সেশনে এই আতঙ্কজনক তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। অর্থ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান স্বাস্থ্য ও ঋণ আদায়ের করুণ চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার নিয়ে আন্তর্জাতিক তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে চলমান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধস নেমেছে, তারই সরাসরি প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে এই পরিসংখ্যানে। কিন্তু কোনো যুদ্ধাবস্থা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের বেশ ভাবিয়ে তুলছে। এই আন্তর্জাতিক তালিকায় বাংলাদেশের ঠিক পরেই রয়েছে আফ্রিকান দেশ চাদ, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং গিনিতে এই হার ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আরও ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বেড়েছে। এর ফলে মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়। শতাংশের হিসাবে যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
আঞ্চলিক বা সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই চিত্র আরও বেশি হতাশাজনক রূপ নেয়। যেখানে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের ওপরে, সেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ভুটানে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কায় এই হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের মতে, এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সামগ্রিক ঋণ শৃঙ্খলা ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতাকে নির্দেশ করছে। ব্যাংক খাতে বছরের পর বছর ধরে চলা নানা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বেনামি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকা ঋণ প্রদান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর আইনি প্রয়োগের অভাবই খেলাপি ঋণের এই পাহাড় জমার প্রধান কারণ। দেশের ব্যাংকিং খাতকে এই গভীর সংকট থেকে টেনে তুলতে হলে এখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।