জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। বয়স মাত্র ১৮ বছর। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তরুণ পেসার মেহেদী হাসান হৃদয়। প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ ধরা পড়ে ব্লাড ক্যানসার। এরপর থেকেই বদলে যেতে থাকে তাঁর জীবনের গতিপথ। শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী এই রোগের কাছে হার মানতে হলো তরুণ ক্রিকেটারকে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন হৃদয়। তাঁর মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর মামা মাপেল হোসেন। অল্প বয়সে সম্ভাবনাময় এই ক্রিকেটারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর পরিবার ও পরিচিতজনদের মধ্যে।
জাতীয় দলের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন হৃদয়
ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন অনেক তরুণের মতো হৃদয়কেও তাড়িত করত। ১৮ বছর বয়সেই চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলে খেলার সুযোগ পাওয়া ছিল তাঁর ক্রিকেটজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। পেস বোলিংয়ে নিজের দক্ষতা আরও বাড়িয়ে ভবিষ্যতে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
কিন্তু কয়েক মাস আগে ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অসুস্থতা। মাঠের অনুশীলন, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট এবং নিজের সামর্থ্য প্রমাণের লড়াইয়ের বদলে তাঁকে মনোযোগ দিতে হয় চিকিৎসার দিকে।
একজন তরুণ খেলোয়াড়ের জন্য এমন পরিস্থিতি শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও কঠিন। যে বয়সে ক্রিকেটাররা নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন, সেই বয়সেই হৃদয়কে লড়তে হয়েছে প্রাণঘাতী রোগের সঙ্গে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার স্বপ্ন।
চিকিৎসায় পাশে দাঁড়িয়েছিল বিসিবি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
হৃদয়ের চিকিৎসার খবর জানার পর তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
গত ২ জুলাই বিসিবির কার্যালয়ে হৃদয়ের বাবার হাতে চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। একই উদ্দেশ্যে বিসিবিও পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। অর্থাৎ, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে তাঁর চিকিৎসার জন্য মোট ১০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
এই সহায়তা হৃদয়ের চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে সহযোগিতা করার উদ্যোগের অংশ ছিল। তবে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া, রোগের পর্যায় কিংবা শেষ সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
থেমে গেল এক তরুণ ক্রিকেটারের পথচলা
বাংলাদেশে ক্রিকেটকে ঘিরে অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার পর অনেকেই জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্যে এগিয়ে যান। হৃদয়ও ছিলেন সেই স্বপ্ন দেখা তরুণদের একজন। কিন্তু অসুস্থতা তাঁর সম্ভাবনাময় যাত্রাকে অকালেই থামিয়ে দিল।
একজন খেলোয়াড়ের মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্যই নয়, তাঁর সতীর্থ, কোচ এবং পরিচিত ক্রিকেটাঙ্গনের মানুষের কাছেও বেদনাদায়ক। বিশেষ করে যে বয়সে একজন ক্রিকেটার নিজের দক্ষতা বিকাশের পাশাপাশি বড় মঞ্চে খেলার প্রস্তুতি নেন, সেই বয়সে তাঁর চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি।
হৃদয়ের জীবনের শেষ কয়েক মাস কেটেছে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে। চিকিৎসার জন্য সহায়তা পেয়েছিলেন তিনি, পাশে ছিল দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মেহেদী হাসান হৃদয় আর কখনো ক্রিকেট মাঠে বল হাতে ছুটে আসবেন না। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্নও আর পূরণ হবে না। তবে অল্প বয়সে বিভাগীয় দলে জায়গা করে নেওয়া এই তরুণ পেসারের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং অসমাপ্ত পথচলা তাঁর পরিবার ও পরিচিতজনদের স্মৃতিতে থেকে যাবে।


