খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হেনেছে প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্প। মাটির নিচে মাত্র ৪০ সেকেন্ডের কম ব্যবধানে পর পর দুটি শক্তিশালী কম্পন পুরো দেশকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রথম ধাক্কাটি ছিল ৭.২ মাত্রার এবং তার রেশ কাটতে না কাটতেই আঘাত হানে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি প্রলয়ঙ্কারী কম্পন। অল্প সময়ের এই তাণ্ডবেই দেশটির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এটি ছিল মূলত অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ (Strike-slip) ধরনের ভূমিকম্প। এই প্রকৃতির ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় এর তীব্র শক্তি সরাসরি ওপরে চলে আসে, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতাও বহুগুণ বেড়ে যায়। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত শতাধিক আফটারশক বা মৃদু কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। এই অনবরত কম্পনের কারণে ভেঙে পড়া বাড়িঘরের নিচে চালানো উদ্ধারকাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি দীর্ঘায়িত হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ভেরিস্ক’-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভেনেজুয়েলার মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতির ঠিক কত অংশ বীমা কাভারেজের আওতাভুক্ত, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই বিপুল আর্থিক অনিশ্চয়তা এখন শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেই ধাক্কা দিচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক পুনঃবীমা (Reinsurance) খাতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ভূমিকম্পের পর স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে ধ্বংসযজ্ঞের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৫৮ হাজারেরও বেশি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। এই তালিকায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ছাড়াও রয়েছে একাধিক হাসপাতাল, প্রধান সড়ক, বিমানবন্দর এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র। ভেনেজুয়েলার কারাকাস, লা গুয়াইরা, পুয়ের্তো কাবেয়ো, ভ্যালেন্সিয়া এবং পেতারে অঞ্চলে ধ্বংসের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
অবকাঠামোগত এই ধ্বংসলীলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবনে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের আশঙ্কা, নিহতের সংখ্যা ১,৯০০ থেকে শুরু করে ৩,৩০০ পার হয়ে যেতে পারে। আহতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন মানুষ জরুরি মানবিক সহায়তার ওপর টিকে আছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা এবং জরুরি আশ্রয়ের চাহিদা যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তা দেশটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি বেশ কয়েক বছর ধরে এমনিতেই চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থানীয় মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন এবং এককভাবে তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে দেশটির সরকারের পুনর্গঠন সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নতুন এই ভূমিকম্প যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিপর্যয়ের এই আঁচ সরাসরি লেগেছে দেশের বীমা খাতেও। ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০টি বীমা কোম্পানি সচল থাকলেও তাদের ব্যবসার বাজার অত্যন্ত ছোট এবং বিচ্ছিন্ন। দেশটির বীমা খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সুদেআসেগ’ (SUDEASEG) পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা তাদের কাজের পরিধি ও সক্ষমতাকে বেঁধে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা করার হার বা বীমা প্রবেশমাত্রা (Insurance penetration) মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ কোনো ধরনের আর্থিক কাভারেজ বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় পড়েছেন।
দেশটির প্রধান বীমা কোম্পানিগুলোর তালিকায় রয়েছে মারকান্তিল সেগুরোস, ম্যাপফ্রে ভেনেজুয়েলা, কারাকাস সেগুরোস এবং হোরিজোন্তে সেগুরোসের মতো বড় নাম। কিন্তু এত বড় জাতীয় ও বৈশ্বিক দুর্যোগ একা সামলানোর মতো আর্থিক ভিত্তি বা সক্ষমতা তাদের কারও নেই। সীমিত কাভারেজ পলিসি, আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানান জটিলতা এবং স্থানীয় মুদ্রার পতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারা—সব মিলিয়ে বীমা খাতের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই ভূমিকম্প এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি, মানবিক বিপর্যয় এবং দুর্বল বীমা ব্যবস্থার এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
মন্তব্য