ভোলার মনপুরা উপজেলায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী পরিত্যক্তা এক নারীকে প্রকাশ্যে মারধর ও শ্লীলতাহানির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা সদরের হাজিরহাট বাজারে মনপুরা থানার একদম সামনেই দিনের আলোতে ঘটে এই হামলার ঘটনা। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী নারীর দায়ের করা মামলায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল অভিযুক্ত হাজিরহাট ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. মাকছুদকে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ, স্থানীয় সূত্র ও মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত মাকছুদের কাছে কিছু টাকা পাওনা ছিল ভুক্তভোগী ওই নারীর। গত বুধবার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পাওনা টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি হাজিরহাট বাজারে যান। এ সময় থানার সামনেই মাকছুদের সঙ্গে ওই নারীর বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে মাকছুদের নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল সংঘবদ্ধ হয়ে ওই নারীর ওপর হামলা চালায়। আসামিরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং পরিধেয় শাড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে শ্লীলতাহানি ঘটায়।
ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে থানায় একটি দ্রুত বিচার ও নারী নির্যাতনের ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় মাকছুদকে প্রধান আসামি করে মোট ছয় জনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার অপর অভিযুক্ত আসামিরা হলেন—রাসেল, তৈয়ব, সোহেল, ফজলু ও লাভলী বেগম। আসামিদের সবার বাড়ি হাজিরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
মামলা দায়েরের পর তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যায় মনপুরা থানা পুলিশ। ঘটনার তিন ঘণ্টার মাথায়, অর্থাৎ দুপুর ৩টার দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত মাকছুদকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারের পর পরই তাকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের অবর্ণনীয় কষ্ট ও আতঙ্কের কথা তুলে ধরেন ভুক্তভোগী নারী। তিনি জানান, পাওনা টাকা ফেরত চাইতে গেলেই মাকছুদ তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। এর আগেও তাকে বেশ কয়েকবার মারধর করা হয়েছে এবং থানায় বা পুলিশের কাছে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কোনো উপায় না পেয়ে পুরো বিষয়টি তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়নকেও জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পর তিনি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তবে ঘটনার পর থেকে হামলাকারীদের সহযোগীদের কাছ থেকে নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে দাবি করেন এই নারী।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে গ্রেফতারকৃত সাবেক যুবদল নেতার পরিবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। মাকছুদের দুই ভাতিজা সুমন ও মামুনের দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল ও প্রতিহিংসার জের ধরে যুবদলের একটি বিরোধী পক্ষ ওই নারীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা করিয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। মনপুরা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন মোল্লা জানান, অভিযুক্ত মাকছুদ হাজিরহাট ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি হলেও বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। তবে দলীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, এক নারীর ওপর এমন প্রকাশ্যে হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অপরাধমূলক কাজ। অপরাধীর বিষয়ে দল কোনো দায় নেবে না বলেও জানান তিনি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, স্বামী পরিত্যক্ত এক নারীকে প্রকাশ্যে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে দ্রুত মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রধান আসামি মাকছুদকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় এমন যেকোনো অপরাধে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি।


