খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে দিনদুপুরে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় নিয়েছে। মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মাহমুদুল হাসান মাহিন বিচারিক আদালতের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। এই কারণে আদালত নির্ধারিত সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ পিছিয়ে আগামী ২৭ জুলাই নতুন দিন ধার্য করেছেন।
রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীরের আদালতে এই অনাস্থার বিষয়টি সামনে আসে। আসামিপক্ষের আইনজীবী মাশরুর হোসাইন আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ পেছানোর জন্য একটি লিখিত আবেদন জমা দেন, যা আদালত মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আসামির আইনজীবী মাশরুর হোসাইন অনাস্থা জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “গত ১২ জুলাই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল। ওই দিন ওয়ান ডিরেকশন বা ভারী বৃষ্টির কারণে আমি সময়মতো আদালতে উপস্থিত হতে পারিনি। আমি এই মামলার সাতজন আসামির পক্ষে আইনি লড়াই চালাচ্ছি। আইনজীবী উপস্থিত না থাকার পরও আদালত একদিনের সময় না দিয়ে অভিযোগ গঠন করে ফেলেন। এ কারণে ওই আদালতের নিরপেক্ষতার ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি আনুষ্ঠানিক অনাস্থা আবেদন দাখিল করেছি, যার ওপর আগামী ২২ জুলাই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।” তিনি আরও জানান, উচ্চ আদালতে অনাস্থা আবেদনটি বিবেচনাধীন থাকায় সাময়িকভাবে এই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ স্থগিত রাখার আবেদন জানানো হয়েছিল।
আলোচিত এই হত্যা মামলায় মোট ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের বর্তমান আইনি ও অবস্থানগত বিবরণ নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | আসামির নাম ও পদবি/উপনাম | বর্তমান আইনি অবস্থা |
| ১ | মাহমুদুল হাসান মাহিন (আবেদনকারী) | কারাগারে বন্দী |
| ২ | আলমগীর | কারাগারে বন্দী |
| ৩ | মনির ওরফে লম্বা মনির | কারাগারে বন্দী |
| ৪ | নান্নু ওরফে নান্নু কাজী | কারাগারে বন্দী |
| ৫ | সজিব ওরফে সজিব বেপারী | কারাগারে বন্দী |
| ৬ | টিটন গাজী | কারাগারে বন্দী |
| ৭ | তারেক রহমান রবিন | কারাগারে বন্দী |
| ৮ | জহিরুল ইসলাম | কারাগারে বন্দী |
| ৯ | পারভেজ | কারাগারে বন্দী |
| ১০ | সাগর | কারাগারে বন্দী |
| ১১ | রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি | জামিনে মুক্ত |
| ১২ | রুমান বেপারী | জামিনে মুক্ত |
| ১৩ | আবির হোসেন | জামিনে মুক্ত |
| ১৪ | জহির | পলাতক |
| ১৫ | ইমরান হোসেন | পলাতক |
| ১৬ | শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম | পলাতক |
| ১৭ | হোসেন চৌকিদার | পলাতক |
| ১৮ | জিয়াউদ্দিন রাজিব | পলাতক |
| ১৯ | সারোয়ার হোসেন টিটু | পলাতক |
| ২০ | মনির ওরফে ছোট মনির | পলাতক |
| ২১ | অপু দাস | পলাতক |
উল্লেখ্য, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৯ জুলাই বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর প্রবেশদ্বারের সামনে পুরোনো তার ও ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে প্রকাশ্য দিবালোকে কংক্রিটের ভারী ব্লক দিয়ে মাথা ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুরো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া এবং এর নেপথ্যে ইন্ধন জোগানো ব্যক্তিদের অনেকেই লাল চাঁদের পূর্বপরিচিত ও সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। মূলত পুরোনো তারের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়। ঘটনার পর নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়া বেশ কয়েকবার মোড় নেয়। প্রথম দফায় তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে একটি চার্জশিট জমা দিলেও তাতে কিছু গুরুতর আইনি ত্রুটি রয়ে যায়। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই অধিকতর তদন্তের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন। গত ২০ জানুয়ারি আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি পুনর্তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্তভার পরিবর্তনের পর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ নতুন করে তদন্ত কাজ শেষ করেন এবং গত ১০ মে ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর গত ২১ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরের আদেশ দিয়েছিলেন। তবে সাক্ষ্যগ্রহণের শুরুতেই অনাস্থা আবেদনের কারণে বিচার প্রক্রিয়া কিছুটা থমকে গেল।