খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:২ পিএম
কাজী সালমা সুলতানা: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক নিভৃতচারী প্রেরণা কাজী আরেফ আহমেদ। ষাটের দশকে সংঘটিত হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, জাতিগত নিপীড়নসহ নানা ঘটনা তাকে রাজনীতিতে উৎসাহিত করে। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও এ সময়ে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন তিনি।
এই কিছুদিনের মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই সহযোদ্ধা সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গড়ে তোলেন গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ এগিয়ে নেওয়া, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, জাতীয় পতাকা রূপায়ণ, ৭০’র নির্বাচন, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণাসহ প্রতিটি পর্বেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে লক্ষ্য পথে এগিয়ে গেছে।
এই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স- বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত হয়। ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু লাহোর বিমানবন্দরে প্রেস কনফারেন্স করে ৬ দফা পেশ করেন।
‘ছয় দফা’ ঘোষণার ফলে বাঙালির স্বাধিকার বিষয়টা সামনে চলে আসে। সে সময়ের ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদ সর্ব প্রথম বিবৃতি দিয়ে ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানান এবং তার নেতৃত্বে ঢাকার রাজপথে বিশাল মিছিল হয়।
১৯৬৪ সাল থেকে তার পৈতৃক বাড়িতে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন ছিল। সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার পর এ মেশিনটিকেই তিনি কাজে লাগান প্রচারযন্ত্র হিসেবে। নিজ হাতে স্বাধীনতার ইশতেহার লিখে এ সাইক্লোস্টাইলে ছেপে বিতরণ করতেন। আর এসব ইশতেহার পড়া শেষে পুড়িয়ে ফেলা হতো।
১৯৭০ সালে গঠন করা হয় ‘জয় বাংলা বাহিনী’। এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ একে একে স্বাধীনতার সব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। নির্ধারণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও স্বাধীনতার পতাকা।
তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এক কক্ষে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা করেন। প্রাথমিকভাবে এটিকে জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা বলা হলেও বিপ্লবী পরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল এটিই হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
বঙ্গবন্ধুর সমর্থন নিয়েই এটি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গঠন করা হয় বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী। তিনি ছিলেন পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরের উপ-অধিনায়ক। বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর চারটি সেক্টরের সঙ্গে হাইকমান্ডের একজন হিসেবে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার প্রধান হিসাবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বলেন – ‘এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের হাতিয়ার ছিল জাতীয়তাবাদ। এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অনুপ্রেরণা ছিল জয়বাংলা। এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের লক্ষ্য ছিল। আসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই মুক্তিযুদ্ধে একক নেতৃত্বে ছিল সেদিনের জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটাই হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
স্বাধীন দেশে আত্মপ্রকাশ করা প্রথম রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী আরেফ আহমেদ। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তিনি এ সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমৃত্যু।
১৯৭৫-এ নৃশংসভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শাহাদাতবরণের পর আওয়ামী লীগ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করতে কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৮০ সালে সমমনা দলগুলো নিয়ে গড়ে তোলেন ১০ দলীয় ঐক্যজোট।
সামরিক শাসক স্বৈরাচার এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও কর্মসূচি দিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৮৭ সালের জুনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি গ্রেপ্তার ও ৯ মাস কারাভোগ করেন।
নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি বহুবার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন । সমাজকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় জাগ্রত করার কথা বলেন। প্রয়োজনে আরেকটি যুদ্ধের জন্যও তৈরি হতে বলেন। এসব নিয়ে তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রা, মোহনা, সুগন্ধা, এখনই সময় পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন।
কাজী আরেফ ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার কালিদাসপুরে একটি জনসভায় বক্তব্যরত অবস্থায় ৪ জন সাথী সহ গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
খবরওয়ালা/ এমএজেড
মন্তব্য