খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই নভেম্বর ২০২৫, ১০:৫৫ পিএম
আমরা প্রায়ই মনে করি, শিক্ষা মানুষের অন্ধত্ব ও উগ্রতার প্রতিষেধক— সমাজ যত বেশি শিক্ষিত হবে, ততই চরমপন্থা কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমেই এই বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইরাক-সিরিয়ার আইএসআইএস সংগঠনে যুক্ত প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের মতোই, সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসক ডা. শাহিন সাঈদ-এর জইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM) নামের সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আমাদের সামনে এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করেছে— উচ্চশিক্ষিত মস্তিষ্কও কখনো কখনো অন্ধ মতাদর্শের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
ডা. সাঈদের ঘটনা একক কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়েও তিনি নাকি তাঁর সম্মানজনক সামাজিক পরিচয়কে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন গোপন উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্য। তাঁর এই ঘটনা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে— নৈতিক ও সামাজিক চেতনার অভাবে কেবল কারিগরি বা পেশাগত শিক্ষা এমন ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারে যারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রখর হলেও আত্মিকভাবে শূন্য ও মানসিকভাবে দুর্বল।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে, মানুষকে শেখায় দ্বিমাত্রিক চিন্তা— সাফল্য না ব্যর্থতা, ঠিক না ভুল, লাভ না ক্ষতি। ল্যাবরেটরি বা অপারেশন থিয়েটারে এ ধরনের চিন্তাধারা কার্যকর হতে পারে, কিন্তু মানবজীবনের নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জটিল বাস্তবতায় তা মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত। এই প্রশিক্ষণ পেশাজীবীদের প্রায়শই সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে; ফলে তারা পৃথিবীকে দেখে কেবল সাদা-কালো দৃষ্টিতে— যা সহজেই উগ্র মতাদর্শের হাতে পরিণত হয় বিপজ্জনক অস্ত্রে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মজ্ঞানহীনতা। ব্যস্ত পেশাগত জীবনের চাপে অনেক শিক্ষিত মানুষ ধর্ম সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে বা ভাবতে পারেন না। তাদের ধর্মবোধ হয় প্রায়শই অন্যের মুখনিঃসৃত— এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে আহৃত যা সংকীর্ণ, রাজনীতিকৃত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে উগ্র। ফলে তাঁরা ধর্মের বিস্তৃত মানবতাবাদী ও দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন না, আর এই অজ্ঞতাই তাঁদেরকে সহজ শিকার বানায় উগ্র মতাদর্শের।
ডা. সাঈদের ঘটনাটি সেই বেদনাদায়ক সংযোগের উদাহরণ— যেখানে বুদ্ধি ও মগজধোলাই একে অপরের হাত ধরে চলে। তাঁর চিকিৎসাগত যোগ্যতা ও সামাজিক মর্যাদা তাঁকে যেমন সন্দেহের বাইরে রেখেছিল, তেমনি তাঁর কার্যকলাপকেও দিয়েছিল বিপজ্জনক বৈধতা। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিবেকহীন শিক্ষা এক অর্ধনির্মিত ভবন, যেখানে আলো না থাকলে অন্ধকার সহজেই জায়গা দখল করে নেয়।
এখন প্রশ্ন একটাই— আমরা কেমন শিক্ষা দিচ্ছি? মুসলিম সমাজ তো বটেই, বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক সমাজেই আমরা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ডেটা সায়েন্টিস্ট তৈরি করছি, কিন্তু বিবেকবান নাগরিক তৈরি করতে পারছি না। সমস্যাটা অশিক্ষায় নয়, শিক্ষার খণ্ডীকরণে। আমরা মস্তিষ্ককে শিক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু হৃদয়কে নয়।
সমাধান বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি শিক্ষাকে বাদ দেওয়া নয়— বরং শিক্ষার সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ করা। আমাদের পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলীর যেমন জীববিজ্ঞান জানা জরুরি, তেমনি মানববিজ্ঞান, নৈতিক কল্পনা, ভাবের ইতিহাস এবং বহুত্ববাদের মূল্যবোধ জানা equally গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা আবার শেখাতে হবে শুধু কীভাবে চিন্তা করতে হয় তা নয়, বরং কেন চিন্তা করতে হয় — এবং কার জন্য চিন্তা করতে হয়।
উগ্রপন্থা বিকশিত হয় তখনই, যখন মেধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সহমর্মিতা থেকে, আর জ্ঞান হারায় মানবিক উদ্দেশ্য। আগামী প্রজন্মকে ‘শিক্ষিত উগ্রপন্থী’ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে, আমাদের গড়তে হবে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে বৈজ্ঞানিক শুদ্ধতা ও নৈতিক চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তি ও মানবতা— দুটোই একসঙ্গে বিকশিত হবে।
তবেই আমরা তৈরি করতে পারব প্রকৃত মানুষ— যারা শুধু দক্ষ নয়, বিবেকবান; যাদের মস্তিষ্ক আলোকিত জ্ঞানে, আর হৃদয় স্থির মানবতার আলোয়।
— খবরওয়ালা সম্পাদকীয় ডেস্ক
দৈনিক খবরওয়ালা | সত্য, চিন্তা, দায়িত্ব
মন্তব্য