যশোরে চুরির অভিযোগে গণপিটুনি, নিহত ১, আহত ১, নিখোঁজ ১

যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের চান্দুটিয়া গ্রামে স্যালোমেশিনচালিত ভ্যান বা আলমসাধু চুরির অভিযোগে সংঘবদ্ধ পিটুনিতে মিজানুর রহমান (৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মনিরুজ্জামান (৪৬) নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ধাওয়া ও আটকের চেষ্টার সময় জীবন বাঁচাতে বাঁওড়ের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন আল আমিন (৪০) নামে আরেক ব্যক্তি। নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল কাজ করছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে নিহত মিজানুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। আহত মনিরুজ্জামান একই হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) গভীর রাতে যশোর সদর উপজেলার চান্দুটিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নারাঙ্গালী গ্রাম থেকে স্যালোমেশিনচালিত একটি ভ্যান চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে চান্দুটিয়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তিকে ধাওয়া করেন এবং তাঁদের আটকানোর চেষ্টা করেন। এ সময় দুজনকে ধরে মারধর করা হয়। এতে মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। মনিরুজ্জামানও পিটুনিতে আহত হন। অপর ব্যক্তি আল আমিন ধরা পড়ার আশঙ্কায় বাঁওড়ের পানিতে ঝাঁপ দিলে নিখোঁজ হন।

স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান জানান, নারাঙ্গালী গ্রাম থেকে আলমসাধু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি চান্দুটিয়া গ্রামের লোকজনকে জানানো হয়েছিল। এরপর স্থানীয়রা অভিযুক্তদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে দুজনকে ধরে মারধর করা হয়। অন্যজন পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

নিহত মিজানুর রহমান চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের কালিয়াকুন্ডি, যা কালিয়াকৈর নামেও পরিচিত, গ্রামের বাসিন্দা। আহত মনিরুজ্জামানের বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। নিখোঁজ আল আমিনের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায়। তিনি নিহত মিজানুর রহমানের ভায়রা ভাই বলে জানা গেছে।

কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর কাজী বাবুল হোসেন জানান, রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিজানুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহত মনিরুজ্জামান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া নিখোঁজ আল আমিনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল কাজ করছে।

চুরির অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন

চুরির অভিযোগের পর স্থানীয়দের ধাওয়া, মারধর এবং একজনের মৃত্যুর ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকি আবারও সামনে এসেছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলে তাঁকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অভিযোগের তদন্ত করাই নিয়ম। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার।

কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে পিটিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার ব্যক্তি বা জনতার নেই। এ ধরনের সহিংসতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে, আবার নিরপরাধ কেউও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে ধাওয়া বা আতঙ্কের পরিস্থিতিতে পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।

চান্দুটিয়ার ঘটনায় ঠিক কী পরিস্থিতিতে মারধর শুরু হয়েছিল, কারা এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং আল আমিন কীভাবে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি চুরির অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং মৃত্যুর কারণ নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ঘটনায় মিজানুর রহমানের মৃত্যু, মনিরুজ্জামানের আহত হওয়া এবং আল আমিনের নিখোঁজ থাকার বিষয়টি ঘিরে এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁর সন্ধান পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঘটনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।