খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৮:৫৩ এএম
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি বিশ্ব অর্থবাজারে আবারও অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দেওয়ার দাবি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজারে সূচক নিম্নমুখী হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সোমবার সকালে লেনদেন শুরুর পর থেকেই এশিয়ার প্রধান শেয়ারসূচকগুলো চাপের মুখে পড়ে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং মার্কিন সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও সুদহার বৃদ্ধির ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে এখন বড় আলোচনার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আবার বাড়তে থাকলে সুদহার আরও বাড়ানো হতে পারে বলে অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ফেডের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেবেন। তাঁর বক্তব্য থেকে ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতির ইঙ্গিত পাওয়ার আশা করছে বাজার।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যও প্রকাশিত হওয়ার কথা। গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানির দাম কিছুটা কম থাকায় মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হলেও সাম্প্রতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে। কয়েক দিন আগেও এর দাম ছিল ৭০ দশমিক ১৪ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়েই যায়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি অতিক্রম করানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য বলছে, স্বাভাবিক নৌচলাচল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন করপোরেট আয় ঘোষণার মৌসুমের দিকে। মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ব্যাংক চলতি প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ শুরু করবে। এরপর নেটফ্লিক্স, জেনারেল ইলেকট্রিকসহ আরও কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের আয় ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ করবে। অনেক বিশ্লেষকের বিশ্বাস, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল এলে বাজারের বর্তমান উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির বিশ্লেষকেরা প্রযুক্তি খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্য ওঠানামা সত্ত্বেও এ খাতের কোম্পানিগুলোর আয় এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী রয়েছে।
তবে সপ্তাহের শুরুতে সেই আশাবাদের প্রতিফলন বাজারে দেখা যায়নি। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাকের ফিউচার সূচক নিম্নমুখী ছিল। ইউরোপের প্রধান শেয়ারসূচকগুলোর ফিউচারও একই প্রবণতা দেখিয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে জাপান বাদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকও নিম্নমুখী হয়েছে।
জ্বালানি বাজার নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামতেও সতর্কতার সুর রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেবের মতে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও এ সময়ের মধ্যে দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হতে পারে, তবু তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তিনি দেখছেন না।
তিনি আরও বলেন, দূরপাল্লার জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা কয়েক সপ্তাহ আগেই করতে হয়। ফলে বিশ্বের অনেক শোধনাগার ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতা কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইজির বাজারবিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত সীমিত। তাঁর ভাষ্য, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতার কারণে বাজারে যে স্বস্তি ফিরেছিল, নতুন করে সংঘাত বাড়ায় তা খুব দ্রুত ভেঙে পড়েছে।
এদিকে বন্ডবাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে ডলারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিপরীতে সুদবাহী সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমে এসেছে।
বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি, শেয়ারবাজার, বন্ডবাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
মন্তব্য