খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৬, ৫:১ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পাদিত এই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হলে তা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটাবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করেছে; দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা এখনও দেয়নি।
বিবিসির আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জেরেমি বোয়েনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান করেছে। তার মতে, সংঘাতটি শুধু ওয়াশিংটনের প্রতিপক্ষদের মোকাবিলার ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি, বরং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, মিত্রদের আস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাত তাদের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে বাধ্য করেছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিকল্প কূটনৈতিক সম্পর্ক, নতুন জোট গঠন এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য স্বাক্ষরিত নথিটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। আলোচনাকারীদের তথ্য অনুযায়ী, দুই পৃষ্ঠার ১৪ দফা সম্বলিত এই নথির সম্পূর্ণ বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।
| বিষয় | সমঝোতায় উল্লেখিত অবস্থা |
|---|---|
| যুদ্ধবিরতি | সংঘাত বন্ধের ভিত্তি স্থাপন |
| হরমুজ প্রণালী | পুনরায় উন্মুক্ত করার পথ তৈরি |
| মার্কিন নৌ অবরোধ | ইরানের বন্দর ঘিরে অবরোধ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা |
| ভবিষ্যৎ আলোচনা | পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা |
তবে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত এবং তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিশ্রুতি।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
এছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, সার উৎপাদনের কাঁচামাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান পরিবহনের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যুদ্ধ চলাকালে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারত, বিশেষ করে দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারণা করেছিল যে দ্রুত সামরিক অভিযান ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক আঘাত এলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং নেতৃত্ব পুনর্গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে কেন্দ্র করে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর প্রভাবশালী কমান্ডারদের অংশগ্রহণে নতুন নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে ওঠে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নেতৃত্ব পূর্বসূরিদের মতোই আদর্শিক অবস্থান বজায় রাখলেও কৌশলগত ঝুঁকি গ্রহণে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রাসী হতে পারে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দেয় এবং আরব প্রতিবেশী দেশ, মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলার কৌশল গ্রহণ করে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার দাবি পরবর্তী পরিস্থিতির আলোকে অতিরঞ্জিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এই সংঘাত পর্যবেক্ষণ করেছে বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর দেশও। বিশেষ করে চীন পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রেখেছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতার বাস্তব সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
যুদ্ধের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল সমঝোতা আলোচনায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তার নীতির কার্যকারিতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা বেড়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, সংঘাতের ফলাফল প্রত্যাশিত না হওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে লেবানন, সিরিয়া ও গাজার কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অবস্থান বজায় রাখা হতে পারে। ফলে নেতানিয়াহু সরকারকে একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—উভয় বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষণে উপসংহারে বলা হয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, আদর্শগত বিরোধ এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট জটিল প্রশ্নের কারণে স্থায়ী সমাধান এখনও অনিশ্চিত।
এই যুদ্ধকে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পক্ষের জন্যই সীমিত সাফল্য ও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের সংঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অক্ষুণ্ন রাখলেও সংঘাত পরিচালনার কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে যুদ্ধের অবসান ঘটলেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য