জামালপুরে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা মামলার রায়ে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাফিজুল জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর এলাকার মৃত প্রধানের ছেলে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সকালে যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে নিজের স্ত্রী হনুফা বেগমকে নির্মমভাবে মারধর করেন হাফিজুল। নির্যাতনের একপর্যায়ে হনুফা বেগমের মৃত্যু হয়। ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা ভোলা থেকে জামালপুরে এসে মরদেহ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেন।
ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিহতের মা আমেনা বেগম বকশীগঞ্জ থানায় পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। বিচার চলাকালে সাক্ষীদের জবানবন্দি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং উপস্থাপিত অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত গৃহবধূর স্বামী হাফিজুলকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। একই মামলায় অভিযুক্ত বাকি চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফজলুল হক রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা মামলার পর আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার মতে, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ রায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
তিনি আরও বলেন, যৌতুকের দাবিতে নারীর ওপর নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধ সমাজে এখনো উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অপরাধের বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হলে সম্ভাব্য অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও হত্যা বাংলাদেশে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের মামলায় আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কঠোর শাস্তি প্রদান করলে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না, বরং সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে প্রয়োজন।