চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যার কারণে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে টানা পাঁচ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর ফলে শুধু অগ্রিম টিকিটের অর্থ ফেরত দিতেই সংস্থাটির প্রায় ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন টিকিট বিক্রি ব্যাহত হওয়া, ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল এবং যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে রেলওয়ের আয়েও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ভারী বর্ষণ ও বন্যাজনিত জলাবদ্ধতায় গত ৭ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এই সময় আগে থেকে বিক্রি হওয়া ১১ হাজার ৩৩৭টি অগ্রিম টিকিট বাতিল করতে হয়। যাত্রীদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে মোট ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা।
তবে এই ক্ষতি কেবল টিকিটের অর্থ ফেরতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় নতুন করে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ট্রেন চালু হওয়ার পরও কয়েক দিন প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী পাওয়া যায়নি। অনেক ভ্রমণপিপাসু কক্সবাজার সফরের পরিকল্পনা বাতিল বা পরিবর্তন করেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজারগামী যাত্রীদের যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় অন্য দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রীসংখ্যার ওপরও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার বলেন, সাধারণ পরিস্থিতিতে রেললাইনের ওপর প্রায় চার ইঞ্চি পর্যন্ত পানি থাকলেও ট্রেন চলাচল সম্ভব। কিন্তু এবারের বন্যায় কিছু স্থানে রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমন অবস্থায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা ছাড়া বিকল্প ছিল না।
তিনি আরও জানান, টানা তিন দিন রেললাইন পানির নিচে থাকায় পানি নেমে যাওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীরা পুরো রেলপথ বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এরপর ১২ জুলাই সীমিত গতিতে বা ‘অ্যাডভান্সড পাইলটিং’ পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা হয়, যাতে লাইনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন দুই ফুট পানির নিচে চলে গেলেও অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছিল। তিনি জানান, এই সময়ে ঢাকা–কক্সবাজার রুটের দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন শুধু ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলাচল করেছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাঁচ দিনের এই সময়ের মধ্যে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন থাকায় পরিচালনাগত ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। তবুও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন রুটে টানা কয়েক দিন ট্রেন বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায়, যাত্রীসেবা এবং ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা বাড়ছে। ফলে চট্টগ্রাম–কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে নিচু এলাকায় রেললাইন উঁচু করা, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতিও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।