রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ২৪ বছর বয়সী যুবক মো. সাগর। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে বিদেশে পাড়ি জমানো এই তরুণ শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েন রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রলোভনে। শনিবার রাশিয়ায় থাকা সাগরের এক বন্ধুর পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার। ছেলের মৃত্যুসংবাদ শোনার পরপরই জ্ঞান হারান তাঁর মা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোকের মাতম।
সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সাগর ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করেছেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনো সম্ভব হয়নি তাঁর। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কিশোর বয়স থেকেই রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া এই তরুণের স্বপ্ন ছিল পরিবারের অভাব দূর করা এবং নিজের জীবনকে একটু ভালোভাবে গড়ে তোলা।
জীবিকার তাগিদে রাশিয়ায় পাড়ি
চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে নিয়মিত পণ্য পরিবহন করতেন সাগর। এ কাজের সুবাদে দোকানটির তৎকালীন ম্যানেজারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ওই ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে গেলেও তাঁদের যোগাযোগ বজায় ছিল। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে তিনি আবারও একই দোকানে কাজ শুরু করেন।
পুরোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে সাগরকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন ওই ম্যানেজার। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং ভালো উপার্জনের আশায় সাগরও বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওই ম্যানেজারের সহযোগিতায় প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি।
রাশিয়ায় গিয়ে একটি বেকারিতে কাজ শুরু করেন সাগর। সেখানে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা ছিল বলে জানা গেছে। পরিবারের জন্য আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন, বেকারির চাকরিতে সেই স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভনে যুদ্ধের পথে
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় এক বাংলাদেশি দালাল সাগরকে দেশটির সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয় তাঁকে। বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার আশায় সাগর ওই প্রস্তাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
চলতি বছরের মে মাসে তিনি বেকারির চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর ওই দালালের কথামতো রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়ে যান বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সাগরকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল জানান, ভাতিজা বেকারির চাকরি ছেড়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা জানালে তিনি তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকা সাগরের পক্ষে বিদেশের সেনাবাহিনীতে কাজ করা কতটা সম্ভব হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই সতর্কতা কাজে আসেনি।
আব্দুল আওয়ালের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাগর নিজের অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে আর স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেননি। একপর্যায়ে সাগরের খোঁজ পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ বাড়তে থাকে স্বজনদের মধ্যে।
বন্ধুর বার্তায় মৃত্যুসংবাদ, ভেঙে পড়েছে পরিবার
গত শনিবার রাশিয়ায় থাকা সাগরের এক বন্ধু তাঁর বোনের মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। বার্তায় জানানো হয়, ‘সাগর আর নেই।’ আকস্মিক এই সংবাদে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েন। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অসুস্থ বাবা কবির হোসেনও শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল জানান, তাঁর বন্ধু সেদিন মৃত্যুসংবাদ পাঠিয়ে রাতে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি আর ফোন করেননি। পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সফল হননি। ফলে সাগরের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি, কোথায় এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এসব বিষয়ে তাঁরা তখনও বিস্তারিত জানতে পারেননি।
পরিবারের কাছে সাগরের মৃত্যুর খবর পৌঁছালেও তাঁর মরদেহের অবস্থান, দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঋণ করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন বাবা
সাগরের বাবা কবির হোসেন একসময় সবজির ব্যবসা করতেন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও ছেলের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় অনেক ধারদেনা করে তাঁকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যে ছেলেকে ঘিরে পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল, তাঁর মৃত্যুসংবাদে সেই পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
কবির হোসেন বলেন, ‘সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধার-দেনা করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছি। প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারি নাই। এখন শুনি আমার ছেলে আর নাই।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের সদস্যদের জন্য সাগরের বিদেশযাত্রা ছিল আর্থিক মুক্তির একটি সম্ভাবনা। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য বয়ে এনেছে অপূরণীয় ক্ষতি।
মৃত্যুর খবর যাচাই ও সহায়তার অপেক্ষায় পরিবার
সাগরের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর পরিবারটি এখন তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরবর্তী করণীয় জানতে অপেক্ষা করছে। রাশিয়ায় অবস্থানরত বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয়টিও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে চান্দিনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সাগরের মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি নাগরিকদের রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ, চাকরির প্রলোভন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চাকরির প্রকৃতি, চুক্তির শর্ত, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে চাকরির প্রস্তাব এলে তার আইনগত ভিত্তি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাগরের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং তাঁর মৃত্যুর স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত বিদেশে স্বপ্নের জীবন গড়তে যাওয়া এক তরুণের মৃত্যুসংবাদে শোকাহত তাঁর পরিবার, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা নিয়ে অপেক্ষা করছে পরবর্তী খবরের।


