আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বোতলজাত ও খোলা—দুই ধরনের সয়াবিন তেলের দামই বাড়বে। তবে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মতি না মেলায় নতুন মূল্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা। এটি বাড়িয়ে ২১৮ টাকা করার আবেদন জানানো হয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাবটি দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি গত ১৩ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের কাঁচামালের দাম গত ছয় মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী। এ সময়ে প্রতি টন কাঁচামালের দাম ১ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসাব করে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২৩৩ টাকা হওয়া উচিত বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপও যুক্ত হয়েছে।
ভোজ্যতেল সমিতির নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা চিঠিতে জানান, ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলোকে লোকসান দিয়ে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত মূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
দেশের বাজারে সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। সে সময় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দুই মাসের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়বে।
কোম্পানিগুলোর চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়ের সময় সরকার দ্রুত আবার দাম পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন নতুন করে দাম সমন্বয় না হওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি করেছে তারা। দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সময়ে পরিবারের খাবার প্রস্তুত এবং বিভিন্ন ধরনের ইফতারসামগ্রী তৈরিতে সয়াবিন তেলের ব্যবহার থাকায় পণ্যটির চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো।
তবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেই তা কার্যকর করা যায় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মতি না পাওয়ায় কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত মূল্য এখনো অনুমোদিত হয়নি। ফলে নতুন দাম কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
সয়াবিন তেল বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। এর দাম বাড়লে সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজারে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। রমজানের আগে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদিত হবে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।


