বাংলাদেশ জাতীয় দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাসকে বোর্ডের অনুমতি ছাড়া চীন সফরের বিষয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আচরণবিধি ও কেন্দ্রীয় চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে রোববার তাকে শৃঙ্খলা কমিটির শুনানিতে ডাকা হয়। শুনানিতে লিটন নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এখন তার বক্তব্য, চোটের বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বোর্ড।
বিষয়টি সামনে আসে জিম্বাবুয়ে সফর শেষে লিটনের দেশে ফেরার পর। জানা গেছে, দেশে ফিরে তিনি বিসিবিকে না জানিয়েই চীনে যান। তার এই সফর নিয়ে বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। মূল উদ্বেগ ছিল, চোটে থাকা একজন কেন্দ্রীয় চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার হিসেবে লিটনের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বোর্ড যখন পুরোপুরি অবগত নয়, তখন তিনি কীভাবে এবং কার অনুমতিতে দেশের বাইরে গেলেন।
বিসিবির পরিচালক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, রোববারই লিটনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ক্রিকেটার নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। এখন বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের মেডিকেল কমিটির সঙ্গে আলোচনা করা হবে। লিটনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তার চোটের প্রকৃত অবস্থা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখার পরই শৃঙ্খলা কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটিকে আপাতত ইচ্ছাকৃত শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখছে না বোর্ড। বরং বিষয়টিকে যোগাযোগের ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় থাকা একজন ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে বোর্ডকে না জানিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করাকে নিয়মের বাইরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবেই দেখছে বিসিবি। তাই কোনো না কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
লিটনের সাম্প্রতিক ক্রিকেটীয় ব্যস্ততার সঙ্গে পুরো ঘটনাটির যোগসূত্রও রয়েছে। চলতি বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে কাফ মাসলের চোটে পড়েন তিনি। সেই চোট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরবর্তী টি-টোয়েন্টি সিরিজেও খেলতে পারেননি। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অনুপস্থিত থাকার পর ওয়ানডে দলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু চোটের সমস্যা আবারও প্রকট হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে ফিরে আসতে হয় তাকে।
পরবর্তী সময়ে লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে খেলার পরিকল্পনাও ছিল লিটনের। সেই কারণে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চোটের কারণে শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতাতেও মাঠে নামা সম্ভব হয়নি তার। দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা এবং প্রত্যাশিতভাবে খেলতে না পারার কারণে লিটন হতাশ ছিলেন বলেও বোর্ডের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
চোটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করতে ২০ জুলাই সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে লিটনের। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত বিষয়গুলোও এখন বিসিবির মেডিকেল কমিটির পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে। ফলে শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার চোটের বাস্তব অবস্থা এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় আসতে পারে।
লিটনের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বড় ধরনের শৃঙ্খলাজনিত বিতর্কের নজির খুব বেশি নেই—বিসিবির পরিচালক আলমগীরও সে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার মতে, লিটনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পেছনে ইচ্ছাকৃতভাবে বোর্ডের নিয়ম অমান্য করার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং বোর্ড ও খেলোয়াড়ের মধ্যে সময়মতো যোগাযোগ না হওয়াই মূল সমস্যা বলে মনে হচ্ছে।
তবে বিসিবি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছে না। আলমগীর স্পষ্ট করেছেন, কোনো ক্রিকেটার যত বড় তারকাই হোন না কেন, বোর্ডের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের কাছে একটি বার্তাও দিতে চায় বোর্ড—কেন্দ্রীয় চুক্তির অধীনে থাকা ক্রিকেটারদের ভ্রমণ, চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বোর্ডকে যথাযথভাবে অবহিত করা জরুরি।
এখন লিটনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শৃঙ্খলা কমিটির হাতে। মেডিকেল কমিটির মতামত এবং শুনানিতে দেওয়া তার বক্তব্য পর্যালোচনার পরই সম্ভাব্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। তবে বিসিবির বক্তব্য থেকে আপাতত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বড় ধরনের শাস্তির চেয়ে নিয়ম ভঙ্গের বিষয়টি ক্রিকেটারদের সামনে স্পষ্ট করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।