খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫
মালয়েশিয়ার রাজনীতির জীবন্ত কিংবদন্তি মাহাথির মোহাম্মদ শততম জন্মদিনে পা রেখেছেন। ১০ জুলাই শতবর্ষ পূর্ণ করলেন এই প্রবীণ নেতা, যিনি দুই দফায় প্রায় ২৪ বছর দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব অক্ষুণ্ন। রোনাল্ড রিগান, মার্গারেট থ্যাচার, লি কুয়ান ইউ ও দেং জিয়াওপিংয়ের মতো বিশ্বনেতাদের সমসাময়িক মাহাথির আধুনিক মালয়েশিয়ার অন্যতম রূপকার হিসেবে ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে মাহাথির মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে কাঁচামালনির্ভর অবস্থা থেকে সরিয়ে বহুমুখী শিল্প-ভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তর করেন। ইলেকট্রনিকস শিল্প হয়ে ওঠে প্রধান রপ্তানি খাত। অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক বাজারে সংযুক্তি—সবকিছুতেই ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব। ১৯৮০ সালে মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল ১ হাজার ৯০০ ডলার, তা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ ডলার।
এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব পথে সমাধান খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মাহাথির। রিঙ্গিতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, মুদ্রাকে ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট উত্তরণে তাঁর নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ঘিরে রয়েছে বিতর্ক। জাতি ও ধর্মভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি কঠোর মনোভাব মালয়েশিয়ার সমাজে দীর্ঘদিন বিভাজনের রেখা টেনে গেছে। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত নিজের বই ‘দ্য মালয় ডিলেমা’তে তিনি মালয়দের ‘অলসতা’ ও পশ্চাৎপদতার জন্য সমালোচনা করেন এবং চীনা ও ভারতীয় সংখ্যালঘুদের তুলনায় তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। একদিকে এই ইতিবাচক বৈষম্যনীতি তাঁকে জনসমর্থন এনে দিলেও অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাসের মনোভাব বারবার সমালোচিত হয়েছে।
দীর্ঘ শাসনকালে মাহাথির স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগেও বিদ্ধ হয়েছেন। মালয় ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি তহবিল বরাদ্দ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ, রাজতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধ এবং ১৯৮৭ সালে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করে শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তারের ঘটনা তাঁর শাসনকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এসব পদক্ষেপ মালয়েশিয়ায় নির্বাহী কর্তৃত্বকে জোরালো করলেও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল করে তোলে।
২০১৮ সালে রাজনীতিতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটান মাহাথির। নিজ দল গঠন করে নির্বাচনে জয়ী হন এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনকে (ইউএমএনও) ক্ষমতাচ্যুত করেন—যে দলটিকে একসময় নিজের হাতেই শক্তিশালী করেছিলেন। তবে নতুন জোট বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালে তিনি ক্ষমতা হারান এবং ২০২২ সালে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হন।
বিশ্লেষকদের মতে, শতবর্ষে পৌঁছেও মাহাথির মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থেকে মুক্ত হতে পারেননি। বহু সংস্কৃতির একটি উদার সমাজ গঠনে তিনি বাধা হয়ে ছিলেন—এমন মত এখনো প্রবল। উন্নয়নের কারিগর হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি বিভাজনের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকাও ইতিহাসে থেকে যাবে।
খবরওয়ালা/এন