খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরের ৫৩ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে নামকরণের একটি প্রস্তাব ঘিরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের বর্তমান অ্যাডহক ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই নাম পরিবর্তনের আবেদন পাঠানো হয়। এই কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান। তবে এই নামকরণের প্রক্রিয়াটি নিয়ে খোদ প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের রাজনৈতিক প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান জানান, প্রতিমন্ত্রী তাঁর নামে নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নেওয়ার জন্য গত ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে একটি আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন। পত্রে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি ও উদ্দেশ্যে তাঁর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তাঁর কাছে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পরিচিতি এবং স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখাই অধিকতর সমীচীন।
উক্ত আধা সরকারি পত্রে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিবরণ সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জমি দান, নিজস্ব অর্থায়নে ভূমি ক্রয়, প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যয়ভার বহন এবং সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তিনি ওই এলাকায় শিক্ষাবিস্তারে অবদান রেখে আসছেন। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯৯৭ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে। প্রতিমন্ত্রীর পত্রে উল্লেখিত তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম | প্রতিষ্ঠার বছর |
| ১. | মীরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | ১৯৯৭ |
| ২. | বেতগাড়ি মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় | ২০০১ |
| ৩. | বেতগাড়ি মীরবাড়ি সরকারি এতিমখানা | ২০০৪ |
| ৪. | বেতগাড়ি মীর শাহে আলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড বিএম মহাবিদ্যালয় | ২০০৪ |
| ৫. | তিয়াইল মীর লাবনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | ২০১২ |
| ৬. | বেতগাড়ি মীর শাহে আলম মৎস্য ও কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট | ২০১৩ |
| ৭. | বেতগাড়ি মীর মাহাতাব-শাহে আলম মহিলা দাখিল মাদ্রাসা | ২০২৩ |
| ৮. | মোকামতলা মীর শাহে আলম-ছাত্তার তালুকদার মহাবিদ্যালয় | ২০২৩ |
| ৯. | কিচক মীর শাহে আলম কলেজ | ২০২৩ |
| ১০. | বেতগাড়ি মীর শাহে আলম ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউট | ২০২৫ |
আধা সরকারি পত্রটির শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছেন যে, এই তালিকাভুক্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানের বাইরে তাঁর বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গ্রহণ বা অনুমোদন করা না হয়।
এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার স্বাক্ষরিত ৯ জুনের এক চিঠির মাধ্যমে জানা যায়, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’ করার একটি আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। এই প্রেক্ষিতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত-২০২৩)-এর ১৪.৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাম পরিবর্তনের সুস্পষ্ট মতামত, যৌক্তিকতা এবং সুপারিশসহ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বগুড়ার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে এর মোট ভূমির আয়তন ৭৪ শতক। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক তিন দফার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান আমাদের প্রতিনিধি -কে জানান, এই বিদ্যালয়ের মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মোজাফফর হোসেন। এই বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেছিলেন মরহুম রফিক উদ্দিন প্রামাণিক এবং মরহুম মুছা চৌধুরীসহ এলাকার বেশ কয়েকজন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় দলের নেতারাই বিভিন্ন সময়ে এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও ইতিপূর্বে কখনো বিদ্যালয়ের মূল নাম পরিবর্তন করার কোনো উদ্যোগ বা চেষ্টা নেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা সম্পর্কে প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম জানান, সাধারণ শাখার পাশাপাশি এখানে কারিগরি শাখাসহ মোট দুটি শাখা চালু রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা মোট ৩৪ জন এবং অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯২৪ জন।
প্রধান শিক্ষক আরও উল্লেখ করেন যে, সব ধরনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে এই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ (সরকারি করণ) হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। তবে বর্তমান সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নির্বাচনের পূর্ব থেকেই এই বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও শিক্ষার মানোন্নয়নে নানাভাবে অবদান রেখেছেন। তাঁর বিশেষ প্রচেষ্টায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মিলনায়তন এবং ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নামাজঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর এই প্রশংসনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর নামে বিদ্যালয়ের নামকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, প্রতিমন্ত্রীর আপত্তির বিষয়টি জানতে পেরে গত ১১ জুন আবেদনটি প্রত্যাহারের জন্য মন্ত্রণালয়ে আরেকটি পাল্টা চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে সাংবাদিকেরা সেই চিঠির অনুলিপি দেখতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রদর্শন করতে পারেননি।