খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সফল ও কিংবদন্তি খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক এবং দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক আবদুস সাদেক আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করার পর আজ শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর বেসরকারি কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই মহান ক্রীড়াবিদের বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি তাঁর কর্মময় জীবনের অসংখ্য গুণগ্রাহী ছাড়াও স্ত্রী, দুই পুত্র এবং এক কন্যাসহ বহু আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা আজ শনিবার বাদ আসর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই (I) ব্লকে অবস্থিত বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আগামী কাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে তাঁর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য, আবদুস সাদেক দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের বড় ভাই। এছাড়া তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইশতিয়াক সাদেক দেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং জনপ্রিয় ক্রীড়াভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ক্রীড়ানুরাগী পরিবারে আবদুস সাদেকের জন্ম হয়। তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন খ্যাতনামা সাঁতারু। পারিবারিক ঐতিহ্য সূত্রে আবদুস সাদেক হকি, ফুটবল ও ক্রিকেট—তিনটি মাধ্যমেই সমান পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন। পাকিস্তান আমলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম রাজনৈতিক ও বৈষম্যমূলক বৈরী পরিবেশের মধ্যেও তিনি নিজের অসামান্য মেধার জোরে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে স্থান করে নেন। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকের পাকিস্তান দলেও তিনি ডাক পেয়েছিলেন, তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইনজুরির বা আঘাতের কারণে সেবার অলিম্পিকে খেলা সম্ভব হয়নি।
১৯৬৯ সালে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে তিনি দেড় মাসব্যাপী এক দীর্ঘ ইউরোপ সফর করেন। এই সফরে দলটির হয়ে তিনি জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেন এবং প্রদর্শন করেন দুর্দান্ত ক্রীড়াশৈলী। সফর শেষে ফেরার পথে মিসরের বিপক্ষেও একটি ম্যাচ খেলেন তারা। সে সময় পাকিস্তান দলের বিশ্বখ্যাত তারকা রশিদ জুনিয়রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। তৎকালীন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ইংরেজি ভাষায় দক্ষ না হলেও আবদুস সাদেকের চমৎকার ইংরেজি দক্ষতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও দলের ভেতরে তাঁর বিশেষ কদর ও আলাদা পরিচিতি ছিল।
শুধু আবদুস সাদেকই নন, তাঁর ছোট ভাই আহমেদ আকবর সোবহানও হকির মাঠে তারকা খেলোয়াড় হিসেবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিলেন। মাঠের রাইট হাফ পজিশনে খেলতেন আহমেদ আকবর সোবহান। দেশ স্বাধীনের পূর্বে তাঁরা দুই ভাই একসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান যুব হকি দলের হয়ে খেলেছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুস সাদেক। সেই টুর্নামেন্টের ঐতিহাসিক ফাইনাল ম্যাচে বড় ভাই আবদুস সাদেকের অধিনায়কত্বে ছোট ভাই আহমেদ আকবর সোবহানের দেওয়া একমাত্র জয়সূচক গোলের ওপর ভর করেই কুমিল্লা জেলা দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়াজগতে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের (বর্তমান ঢাকা আবাহনী লিমিটেড) ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শেখ কামাল নতুন এই দলকে সুসংগঠিত করার জন্য একজন যোগ্য নেতার সন্ধান করছিলেন। তিনি স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশা ক্লাবের হয়ে মাঠ কাঁপানো তারকা আবদুস সাদেকের কাঁধে ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি—উভয় দলের প্রথম অধিনায়কের গুরুদায়িত্ব তুলে দেন। শেখ কামালের সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে হকিতে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করার গৌরব এনে দেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর ১৯৭৭ সালে তিনি আবাহনী ফুটবল দলের প্রধান কোচের বা প্রশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন; তাঁর পরিচালনায় ১৯৭৭ সালের লিগে আবাহনী কোনো ম্যাচ না হেরে ৩টি ড্র ও বাকি সব ম্যাচে দাপুটে জয় পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ‘অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার বিরল কীর্তি স্থাপন করে।
ক্রীড়াবিদ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে আবদুস সাদেককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। আবদুস সাদেকের হকি ক্যারিয়ার, কোচিং ও সাংগঠনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাইলফলক নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| সময়কাল/বছর | দায়িত্ব ও অর্জিত গৌরব | বিবরণ ও বিশেষ অর্জন |
| ১৯৬৯ | পাকিস্তান হকি দলের ইউরোপ সফর | জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের ৭টি দেশ ও মিসরে ম্যাচ খেলা। |
| ১৯৭২ | আবাহনী ক্রীড়াচক্রের দায়িত্ব লাভ | ঢাকা আবাহনীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রথম ফুটবল ও হকি দলের অধিনায়ক। |
| ১৯৭৩ | জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপ | কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক হিসেবে ছোট ভাইয়ের গোলে চ্যাম্পিয়ন লাভ। |
| ১৯৭৭ | আবাহনী ফুটবল দলের কোচ | অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে লিগ জয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড। |
| ১৯৭৭-১৯৭৮ | বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক | শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেশের প্রথম হকি টেস্ট সিরিজ ও প্রথম এশিয়ান গেমসে নেতৃত্ব। |
| ১৯৮৩-১৯৮৫ | হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক | ১৯৮৫ সালে জাপানের পরিবর্তে সফলভাবে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকি আয়োজন। |
| ১৯৯৬ | জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ | ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রাপ্তি। |
প্রশিক্ষণ পেশা ছেড়ে দেওয়ার পর আবদুস সাদেক একজন সফল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুনিপুণ কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই ১৯৮৫ সালে এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বৈঠকে জাপানকে সরিয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় এশিয়া কাপ হকি টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বাগতিক হওয়ার অধিকার লাভ করে। সে সময় পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইরানের মতো শক্তিশালী দেশগুলো সাদেকের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ হকির যে সফল আসর বসেছিল, তার পেছনেও নেপথ্য কারিগর ছিলেন আবদুস সাদেক। বাংলাদেশের হকিতে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, যেমন—ফ্লাডলাইট স্থাপন ও ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ড চালুর পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের (FIH) তৎকালীন সভাপতি নেগ্রে যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন প্রথম দেখাতেই আবদুস সাদেককে কিংবদন্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিলেন, “সাদেক একজন কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড়। আমার বিশ্বাস, সাদেকের হাত ধরেই হকির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।”
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর চরম রাজনৈতিক সংকটে আবাহনী ক্লাবটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে এক ভয়াবহ সংশয় ও ভীতি তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক কর্মকর্তা ও সংগঠক আত্মগোপনে চলে যান কিংবা দেশ ত্যাগ করেন। তবে সেই চরম দুঃসময়ে শেখ কামালের স্মৃতিবিজড়িত আবাহনীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন আবদুস সাদেক। তিনি ধানমণ্ডিতে অবস্থিত নিজের বাসভবনে ক্লাবের সবাইকে একত্রিত করেন এবং ক্লাবকে পুনরুজ্জীবিত করে পুনরায় মাঠে নামানোর নেতৃত্ব দেন। সংকটের মুহূর্তে তাঁর এই অবিস্মরণীয় অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে পরবর্তীতে ‘আবাহনী লিমিটেড’ তাঁকে ক্লাবের ‘আজীবন সদস্য’ পদ প্রদান করে।
আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের প্রথম দিককার ভিত্তিপ্রস্তরও তৈরি হয়েছিল তাঁর হাত ধরে। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে যখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় হকি দল গঠন করা হয়, তখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের প্রথম টেস্ট সিরিজে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন আবদুস সাদেক। সেই টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ একটি ম্যাচে জয়, একটিতে ড্র এবং একটিতে পরাজিত হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়, তখনো দেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়কের গৌরবময় দায়িত্ব পালন করেন এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ আবদুস সাদেক। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।