খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪৩ পিএম
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের নন্দিত অভিনেত্রী সুজাতা—একটি নাম, একটি অধ্যায়, একটি অনন্য চলচ্চিত্র-স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতির সঙ্গে অমোচনীয়ভাবে জড়িয়ে আছে ‘রূপবান’—যে চলচ্চিত্র তাঁকে বাংলার অগণিত দর্শকের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।
আজ ১০ আগস্ট, বর্ষীয়ান এই প্রিয় অভিনেত্রীর জন্মদিন।
১৯৪৭ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুজাতা। তাঁর প্রকৃত নাম তন্দ্রা মজুমদার। পিতা গিরিজানাথ মজুমদার এবং মাতা বীণাপাণি মজুমদার।
ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। কর্মজীবনের শুরুতে মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শিল্পজগতে তাঁর পথচলা। এরপর ১৯৬৪ সালে ওবায়দুল হকের ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর।
মূল অভিনেত্রী হিসেবে কাজী খালেক পরিচালিত ‘মেঘ ভাঙা রোদ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৬৫ সালের ‘রূপবান’ তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। রূপবান যেন শুধু একটি চলচ্চিত্রের চরিত্র ছিল না—সুজাতার অভিনয়ে তা হয়ে উঠেছিল বাংলার মানুষের স্বপ্ন, আবেগ ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
‘রূপবান’ মুক্তির ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রূপবানকন্যার আবেদন আজও ম্লান হয়নি। সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে সুজাতার জন্য যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল, তা আজও অমলিন।
স্বর্ণযুগের জনপ্রিয় অভিনেতা আজিমের সঙ্গে ১৯৬৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুজাতা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় চলচ্চিত্র।
‘অর্পণ’, ‘অবুঝ মন’, ‘প্রতিনিধি’, ‘বেইমান’, ‘এতটুকু আশা’, ‘ধারাপাত’, ‘মেঘ ভাঙা রোদ’, ‘রূপবান’, ‘রহিম বাদশাহ ও রূপবান’, ‘রাজা সন্ন্যাসী’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘ডাক বাবু’, ‘জরিনা সুন্দরী’, ‘অপরাজেয়’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘কাঞ্চনমালা’, ‘আলিবাবা’, ‘মধুমালা’, ‘রাখাল বন্ধু’, ‘চেনা অচেনা’, ‘শহীদ তিতুমীর’, ‘মোমের আলো’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’, ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’, ‘অবাঞ্ছিত’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ছুটির ঘণ্টা’—এমন অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৭৮ সালের পর দীর্ঘ সময় অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও পরবর্তীতে আবারও অভিনয়ে ফিরে আসেন তিনি। মঞ্চ ও রূপালি পর্দার পাশাপাশি টেলিভিশনেও রেখেছেন তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন একুশে পদক এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। এছাড়াও পেয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সম্মাননা, যার মধ্যে রয়েছে স্টার অ্যাক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের আজীবন সম্মাননা এবং সম্প্রতি এটিএন বাংলা আজীবন সম্মাননা।
শুধু অভিনয়েই থেমে থাকেননি সুজাতা। লেখিকা হিসেবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি বই ইতোমধ্যে পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা।
একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পুরস্কার নয়—
দর্শকের হৃদয়ে নিজের জন্য একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে নেওয়া।
সুজাতা সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী।
তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের স্বপ্নের নায়িকা,
একটি সময়ের রূপকথার রাজকন্যা,
আর আজ—বাংলা চলচ্চিত্রের জীবন্ত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
শুধু একবার বলে যাও—
তুমি যে আমার কত প্রিয়…
সময়ের কণ্ঠ পেরিয়ে আজও যেন সেই গানটি ফিরে আসে তাঁর অভিনীত দিনগুলোর স্মৃতি হয়ে। 🎶
জন্মদিনে প্রিয় শিল্পীর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অফুরান ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভকামনা।
সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, আলোকিত থাকুন আরও বহু বছর।
বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সুজাতাকে জানাই শুভ জন্মদিন ও হৃদয়ভরা অভিনন্দন।
শুভ জন্মদিন, রূপবানকন্যা।
আপনার শিল্পীসত্তা ও সৃষ্টির আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক।
মন্তব্য