খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই মে ২০২৬, ৭:৮ এএম
ত্যাগ ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। দেশ ও মানুষের জন্য নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন আজীবন, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই চাননি। প্রতিদানের প্রত্যাশাহীন এই মানুষটি ছিলেন জনমানুষের নেতা, শ্রমজীবী মানুষের আশ্রয়স্থল এবং স্বাধীনতার চেতনায় অবিচল এক সাহসী সৈনিক।
দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সংগ্রামে ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক সশস্ত্র যুদ্ধে তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। একবার শত্রুরা চারদিক থেকে তাঁদের ঘিরে ফেললেও তিনি ভেঙে পড়েননি। জীবন বাজি রেখে স্টেনগান হাতে পাশের খালে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে পাল্টা আক্রমণ চালান। তাঁর সেই দুর্বার সাহস ও নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
আরেক যুদ্ধে নির্মম বেয়নেট আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়েও তিনি হার মানেননি। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে ডান হাতে বেয়নেট সরিয়ে আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দাঙ্গাবাজার, টঙ্গী টিএসসি, ছয়দানা কিংবা কাশিমপুর—প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সাহস, প্রেরণা ও নেতৃত্বের প্রতীক। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত যুদ্ধে শত্রু ঘাঁটিতে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিজয়ের পথ সুগম করেছিলেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা আহসানউল্লাহ মাস্টার শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষকও। শিক্ষা ও রাজনীতির এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার চেতনা, মানবতা ও দেশপ্রেম ছাত্রদের হৃদয়ে বপন করেছিলেন একজন নিখুঁত শিল্পীর মতো।
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের শিক্ষক এবং মানবিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।
তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষ। শ্রমিক, মেহনতি মানুষ ও অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিরলস কাজ করেছেন। শ্রমিকদের মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ কল্যাণমূলক নানা উদ্যোগেও তিনি ছিলেন অগ্রণী।
গাজীপুরের মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক ছিলেন তিনি। ১৯৮৩ সালে পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করেন অবিরাম।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ দৃঢ় ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। জাপান সফরে শ্রমিক নেতারা উপহার দিতে চাইলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে জাপানের জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ছবি সংরক্ষণের অনুরোধ জানান। এটি ছিল জাতির জনকের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে যেমন তিনি ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা, তেমনি গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের আন্দোলনেও ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী। ঘাতকেরা তাঁকে হত্যা করলেও তাঁর আদর্শ, সাহস ও মানবিক রাজনীতি আজও মানুষের হৃদয়ে অমলিন।
জন্ম : ৯ নভেম্বর ১৯৫০
মৃত্যু : ৭ মে ২০০৪
বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করছি জননেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে। তাঁর আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে বেঁচে থাকুক।
মন্তব্য