রাজধানীর একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও জটিল রোগে আক্রান্ত পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর পর তার মরদেহ নিয়ে ভোলায় ফিরে গেছেন বাবা-মা। দীর্ঘ চিকিৎসা যাত্রা, একাধিক হাসপাতাল পরিবর্তন এবং আর্থিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
শিশুটির নাম মো. তাকরিম। গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর আগে তাকে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি একাধিক হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুর পর দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বাবা-মা হাসপাতালেই অবস্থান করেন এবং পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা দেন।
শিশুটির মা আমেনা বেগম সন্তানের মৃত্যুতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সন্তানের মরদেহ বুকে নিতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বারবার বিলাপ করে বলতে থাকেন, সন্তানকে এভাবে হারানো তিনি মেনে নিতে পারছেন না। বাবা মো. মহসীনও গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নাতির মৃত্যুর খবর জানান।
চিকিৎসা যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
নিচের সারণিতে শিশুটির চিকিৎসা যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল |
স্থান |
চিকিৎসা অবস্থা ও সিদ্ধান্ত |
| প্রথম ধাপ |
ভোলা জেলা হাসপাতাল |
জ্বর, কাশি ও র্যাশের চিকিৎসা; প্রাথমিকভাবে অ্যালার্জি হিসেবে শনাক্ত |
| পরবর্তী ধাপ |
স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্র |
অবস্থার অবনতি; একাধিকবার চিকিৎসক পরিবর্তন |
| মধ্যবর্তী ধাপ |
রাজধানীর একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
হাম ও জটিল সংক্রমণ শনাক্ত; উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন নির্ধারণ |
| শেষ ধাপ |
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল |
শিশু নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়; মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চিকিৎসা চলমান |
রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিয়ে মতপার্থক্য
পরিবারের অভিযোগ, ভোলায় চিকিৎসার সময় শিশুটির রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত হয়নি। প্রথমে তাকে অ্যালার্জি হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে হাম ও পরবর্তী জটিল সংক্রমণ শনাক্ত হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় হলে শিশুটিকে আগেই উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা সম্ভব হতো।
চূড়ান্ত চিকিৎসা অবস্থা
পরবর্তীতে শিশুটিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তখন তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ, রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতি এবং জন্মগত হৃদযন্ত্রে ছিদ্র—এই সব জটিলতা মৃত্যুর কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, তবে শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি
চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনের পর একজন মন্ত্রী চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করেন। তার পক্ষ থেকে হাসপাতালের বিল পরিশোধ এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে চিকিৎসা ব্যয় মেটানো হলেও শেষ পর্যন্ত শিশুটির জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
শিশুটির বাবা পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। পরিবারের অন্য একটি সন্তানও রয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষে সন্তান হারিয়ে তারা ভোলায় ফিরে যান।
এই ঘটনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয় ও সময়মতো স্থানান্তরের গুরুত্ব আবারও আলোচনায় এসেছে।