খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৬ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় এক লোমহর্ষক ও অত্যন্ত মর্মান্তিক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার বলরামচক চৌধুরীপাড়া গ্রামে এক যুবক তাঁর নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও মাত্র দুই বছর বয়সী অবুঝ কন্যা সন্তানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর নিজে বিষপান করে অথবা আত্মঘাতী হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে সংঘটিত এই পৈশাচিক ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টিকে পারিবারিক কলহের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী এবং পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বলরামচক চৌধুরীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা গৌতম সরকারের ছেলে জয় সরকার (২৭) বেশ কিছুদিন ধরে পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যায় মানসিক চাপে ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে জয় তাঁর স্ত্রী বৃষ্টি সরকার (২২) এবং একমাত্র সন্তান জিনি সরকারকে নিয়ে নিজ কক্ষে ঘুমাতে যান।
রাত আনুমানিক সাড়ে বারোটার দিকে প্রতিবেশীরা ঘর থেকে আর্তচিৎকার শুনতে পান। দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান ঘরের মেঝেতে বৃষ্টি ও শিশু জিনির রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। জয় সরকারকে পাশের একটি স্থানে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, গভীর রাতে কোনো তর্কের এক পর্যায়ে জয় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর জয় নিজেও আত্মঘাতী পথ বেছে নেন।
নিহত জয়ের বাবা গৌতম সরকার এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এই ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসীরা জানান, জয় পেশায় একজন সাধারণ শ্রমজীবী ছিলেন এবং স্ত্রী বৃষ্টির সঙ্গে তাঁর মাঝে মাঝেই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হতো। কিন্তু সেই বিরোধ যে এমন চরম ও নৃশংস পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বিশেষ করে দুই বছরের শিশু জিনির প্রাণহীন দেহ দেখে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। গ্রামবাসীর মতে, এটি একটি সাজানো সংসার ছিল যা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
খবর পাওয়ার পরপরই আত্রাই থানার উপ-পরিদর্শক শাহাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ ঘর তল্লাশি করে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি এবং একটি বিষের বোতল উদ্ধার করেছে। এসআই শাহাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে এটি একটি হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তীতে আত্মহত্যা হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো গোপন শত্রুতা বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গভীর রাতে এই ঘটনা ঘটায় প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া দুষ্কর, তবে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ জয় সরকারের বিরুদ্ধেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পাশাপাশি এক ধরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অসহিষ্ণুতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে সমাজে এই ধরণের অপরাধের হার বাড়ছে। তুচ্ছ ঘটনার জেরে আপনজনদের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা রোধে সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা জরুরি।
আত্রাই থানা পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই ট্র্যাজেডির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। আপাতত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পুলিশ পুরো এলাকাটিতে বিশেষ নজরদারি বজায় রেখেছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়।