রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) সংলগ্ন পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি রক্ষা এবং সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত কয়েক দিন ধরে চলা এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ বুধবার সকালে মেলা মাঠের নির্মাণাধীন স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক পদক্ষেপে পুরো এলাকায় সাময়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্মাণকাজে যুক্ত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন যে ঐতিহ্যবাহী এই মাঠে সচিবালয় সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মাঠের একাংশে বিভিন্ন বাণিজ্যিক মেলার আয়োজন চলছে। শিক্ষার্থীদের সাফ কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মাঠ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না। ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’—এমন একটি ব্যানার হাতে নিয়ে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী মাঠে প্রবেশ করেন এবং নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্টল ও মূল ফটকে ভাঙচুর চালান। এ সময় পুলিশের একটি দল উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে তারা কার্যকর কোনো বাধা দিতে পারেনি। ভাঙচুরের পাশাপাশি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতিও শিক্ষার্থীরা নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের চারপাশে দেওয়া টিনের বেড়ার বেশ কিছু অংশ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলা হয়েছে। মেলার জন্য তৈরি করা কাঠের কাঠামো মাটিতে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। শ্রমিক ও কারিগররা ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল গুটিয়ে নিচ্ছেন। যুব মেলার স্টল নির্মাণের কাজে যুক্ত ইউসুফ সর্দার আক্ষেপের সুরে জানান, তাঁরা সরকারি যথাযথ অনুমতি নিয়েই এখানে কাজ করছেন। মাঠ বা নীতিগত কোনো আপত্তি থাকলে তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে; কিন্তু সাধারণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর এমন আক্রমণ কেন করা হলো, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার স্টল নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, ক্ষিপ্ত শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করেই এসে মূল ফটক ও কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলেন। এতে তাঁদের কয়েক লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো, পুরোনো বাণিজ্য মেলার এই মাঠটি মূলত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকাজের জন্য বরাদ্দ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাঠে সচিবালয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলে শিক্ষার্থীদের প্রায়োগিক শিক্ষা ও গবেষণা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার মাঠেই সচিবালয় স্থাপনের প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার কাজ শুরু হলে শিক্ষার্থীরা আরও উগ্র হয়ে ওঠেন। দুপুরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তাঁরা পরীক্ষার স্থানে যান এবং মাটি পরীক্ষার যন্ত্রাংশ ও দুটি গাড়ি জোর করে ক্যাম্পাসে নিয়ে আটকে রাখেন। একই সঙ্গে মাঠ রক্ষার এই দাবিতে তাঁরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে একটি স্টিয়ারিং কমিটিও গঠন করেছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও তৎপর হয়ে উঠেছে। শেকৃবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি প্রশাসনিকভাবে সমাধানের জন্য তারা কাজ করছেন। ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ভাঙচুর বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। মাঠ ফিরে পাওয়ার এই আন্দোলন কতদূর গড়ায় এবং প্রশাসন কী ধরনের সমাধান নিয়ে আসে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


