সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা বাড়াতে মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের জন্য ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এড়িয়ে চলার মতো বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জানানো হয়। এতে চালকদের শুধু ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়টিই নয়, সড়কের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে যানবাহন চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুলিশের নির্দেশনায় মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী—দুজনেরই হেলমেট পরার কথা বলা হয়েছে। মোটরসাইকেলে চালকসহ সর্বোচ্চ দুজন চলাচল করতে পারবেন। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো যেমন নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই নির্ধারিত সংখ্যার বেশি যাত্রী না নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গাড়িচালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। গাড়িতে বসার পর সিটবেল্ট বাঁধা নিরাপদ যাত্রার একটি মৌলিক সতর্কতা। একই সঙ্গে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। ফোনে কথা বলা, বার্তা পড়া কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার ফলে চালকের দৃষ্টি ও মনোযোগ সড়ক থেকে সরে যেতে পারে। ব্যস্ত সড়ক বা দ্রুতগতির যান চলাচলের এলাকায় কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতাও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানোর নির্দেশনাও রয়েছে পুলিশের তালিকায়। সড়কে অতিরিক্ত হর্ন শব্দদূষণ বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য চালক ও পথচারীদের জন্যও বিরক্তির কারণ হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্ক সংকেত দেওয়ার মধ্যেই হর্নের ব্যবহার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত গতিসীমা অনুসরণ এবং ট্রাফিক সিগন্যাল যথাযথভাবে মেনে চলার ওপরও জোর দিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে মোড়, ব্যস্ত সংযোগস্থল, পথচারী পারাপারের এলাকা কিংবা যানজটপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত গতি বিপদের মাত্রা বাড়াতে পারে। তাই রাস্তার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ গতিতে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বড় ও ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে ‘ব্লাইন্ড স্পট’ সম্পর্কে সতর্ক থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বড় যানবাহনের চালকের আয়নায় বা দৃষ্টিসীমায় সব সময় পাশের ছোট যান দেখা নাও যেতে পারে। ফলে এসব যানবাহনের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করলে মোটরসাইকেল বা ছোট গাড়ি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলার পরামর্শ এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
লেন পরিবর্তন কিংবা মোড় নেওয়ার আগে ইন্ডিকেটর ব্যবহার করার কথাও বলা হয়েছে। আগেভাগে সংকেত দিলে পেছনে ও পাশে থাকা যানবাহনের চালকেরা গাড়ির গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি সামনে চলা যানবাহনের সঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেও বলা হয়েছে। এতে সামনের গাড়ি হঠাৎ গতি কমালে বা ব্রেক করলে পেছনের যানবাহনের চালক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় পান।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময়ও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পুলিশ। কুয়াশা, বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৃশ্যমানতা কমে গেলে গতি কমিয়ে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাস্তা ভেজা থাকলে বা সামনে পরিষ্কারভাবে দেখা না গেলে স্বাভাবিক গতিতে চলার পরিবর্তে পরিস্থিতি বুঝে গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
যানজট বা অন্য কোনো চালকের ভুল আচরণে উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্য ধরে গাড়ি চালানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় তাড়াহুড়ো করে পাশ কাটানো, প্রতিযোগিতামূলকভাবে গতি বাড়ানো কিংবা রাগের বশে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াতে পারে। নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোই চালকের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মাদক সেবন করে কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উল্টো পথে যানবাহন চালানো নিষেধ করা হয়েছে। মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং না করে নির্ধারিত লেন অনুসরণ করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওভারটেক করার আগে সামনে পর্যাপ্ত জায়গা আছে কি না এবং বিপরীত বা পাশের লেনে অন্য যানবাহন আসছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ ছাড়া চালকদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে রাখার পাশাপাশি যানবাহনের প্রয়োজনীয় ও হালনাগাদ কাগজপত্র রাখার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইন মেনে যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে পুলিশের ১২ নির্দেশনার কেন্দ্রে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক বিষয়—সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, গতি নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ধরে রাখা, ট্রাফিক আইন মানা এবং অন্য যানবাহনের প্রতি সতর্ক থাকা। সড়কে একজন চালকের সিদ্ধান্ত শুধু তার নিজের ওপর নয়, আশপাশে থাকা বহু মানুষের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে।
তাই প্রতিটি যাত্রায় হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, মোবাইল ফোন এড়িয়ে চলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, ইন্ডিকেটর ব্যবহার এবং আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি অনুযায়ী গতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো অভ্যাসে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেও এসব নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।


