সড়কে সাড়ে ৬ বছরে প্রায় ৮ হাজার শিশুর মৃত্যু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে কিশোররা

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গত ছয় বছর নয় মাসে প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে মৃত্যু হয়েছে প্রায় তিন হাজার শিশুর। পথচারী হিসেবেও প্রাণ হারিয়েছে হাজারো শিশু।

বুধবার সকালে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ধরন, বয়সভিত্তিক চিত্র, দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক এবং প্রাণহানির সময় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী ছিল, যা মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু বা ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

পথচারী শিশুদের জন্য বিপজ্জনক সড়ক

পথচারী হিসেবে নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। সিএনজি, অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটির মতো যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ২৭১ শিশু। পথচারী হিসেবে নিহতদের মধ্যে এ হার ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।

বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ১ হাজার ১২৬ শিশু, যা পথচারী হিসেবে নিহতদের ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কা বা চাপায় ৩১৭ শিশু এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান বলছে, সড়কে হাঁটা কিংবা রাস্তা পারাপারের সময় শিশুরা নানা ধরনের যানবাহনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফুটপাতের অভাব, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা এবং যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

গ্রামীণ সড়কেই প্রাণহানি বেশি

শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কের পাশ দিয়ে বসতবাড়ি গড়ে ওঠা, যানবাহনের নিয়মনীতি না মানা এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব এলাকায় শিশুদের সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকাও ঝুঁকি বাড়ায়।

বিকেলেই সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু

দিনের কোন সময়ে বেশি শিশু প্রাণ হারাচ্ছে, সেই বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিকেলে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু।

এ ছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সকাল ও বিকেলে শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতসহ বিভিন্ন কাজে বাইরে চলাচল করতে হয়। তবে শুধু সময়ের পরিসংখ্যান দিয়ে দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দুর্ঘটনার স্থান, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা এবং শিশুদের চলাচলের উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছে ১৩ থেকে ১৭ বছরের শিশুরা

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহত শিশুদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সের ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃত্যুর যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ২১ ও ১৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এই দুই বয়সী গোষ্ঠীর।

এই চিত্র শিশুদের বয়স অনুযায়ী আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের তত্ত্বাবধান ও নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ জরুরি। অন্যদিকে কিশোরদের সড়ক ব্যবহারের নিয়ম শেখানো, মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে যানবাহন না দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্কুলে যাওয়া-আসার পথেও ঝুঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একইভাবে আবাসিক এলাকার সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের খেলার উপযোগী নিরাপদ স্থান তৈরি করাও জরুরি।

নিরাপত্তার ঘাটতি ও চিকিৎসাসংকট

শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে শিশুবান্ধব সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার অভাব, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে অসচেতনতা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া।

অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানোও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসার সংকট এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ না থাকা কিংবা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারা তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি আহত শিশুদের দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ

শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সচেতন করা এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সুযোগ ও সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রয়োজনীয় সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। ফলে সড়কে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, অনেকে আবার স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছে।

প্রায় সাত বছরে প্রায় আট হাজার শিশুর প্রাণহানির এই চিত্র সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। নিরাপদ সড়ক পরিকল্পনা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ, শিশুদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং সাধারণ মানুষেরও সম্মিলিত দায়িত্ব। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সড়কে শিশুমৃত্যুর এই উদ্বেগজনক চিত্র বদলানো কঠিন হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।