সর্বমুখী মূল্যবৃদ্ধিতে চাপ বাড়ছে জীবনে, স্বস্তির খোঁজে সীমিত আয়ের মানুষ

খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং ইউটিলিটি বিল—সবদিক থেকেই আসছে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা। ক্রমাগত জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। দৈনন্দিন সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিদিন তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশি বা আমদানিকৃত কোনো পণ্যেই সাধারণ মানুষ স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন না।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তার সুফল বাস্তবে মিলছে না। গত কয়েক মাসে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ভোজ্যতেল, আটা, ডাল, লবণ, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধের মতো নিত্যপণ্যের দর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উপরন্তু, শীত শেষ হয়ে বর্ষা শুরু হওয়ায় কাঁচাবাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে প্রতি ডলারে আমদানি খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যার দায় চাপছে ভোক্তাদের ওপর। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বাড়ায় দেশীয় শিল্পকারখানাগুলোও পড়ছে চরম আর্থিক চাপের মুখে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে সরকারকে চড়া দামে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর থেকে ভর্তুকি কমানোর ফলে পরিবহন ভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং কারখানার উৎপাদন খরচ একযোগে বেড়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দর ছাড়াও সরকারের নীতিগত সামঞ্জস্যের অভাব এই সংকটের বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণার পাশাপাশি ঋণের সুদহার কমানোর চেষ্টা, বন্ধ কারখানা চালুর বিশাল তহবিল গঠন এবং সম্প্রসারণমূলক বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মূল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, সুদের হার কমানো এবং সরকারের সম্প্রসারণমূলক নীতি বাজারমূল্য কমানোর ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় আয় বাড়েনি, ফলে সামগ্রিক জীবনযাত্রায় কোনো স্বস্তি আসছে না।
বিদ্যমান এই কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরও। সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিনি নিজে অসন্তুষ্ট। তবে কেবল বাজার তদারকি করে পণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়; এর সঙ্গে শক্তি ও বিদ্যুৎ খাত, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন খরচ এবং সুদের হারের মতো বিষয়গুলো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। আমাদের দেশে লজিস্টিক ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে পণ্যের খুচরা মূল্যে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং উন্নত অবকাঠামো গড়ে তুলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছে সরকার।
টিসিবি ভর্তুকি মূল্যে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করে কিছুটা সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও চাহিদার তুলনায় তা অতি সামান্য। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সুবিধাগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় তা সুদূরপ্রসারী কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। ফলে সব দিক থেকেই সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেট এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর