অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিমা পরিষেবার মানোন্নয়নের ওপর ভর করে সৌদি আরবের বিমা খাত নতুন এক প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪.৩ শতাংশ বেড়ে ১.৮৭ বিলিয়ন রিয়ালে (প্রায় ৪৯৮.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, কেবল ব্যবসার পরিধি বাড়ানোই নয়, বরং রাজস্বকে টেকসই মুনাফায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রেও দারুণ সফল হচ্ছে দেশটির বিমা খাত।
সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনৈতিক সংস্কার ও নতুন অবকাঠামোগত প্রকল্পের কারণে দেশটিতে স্বাস্থ্য ও মোটর বিমার পাশাপাশি নানা ধরনের করপোরেট বিমা কাভারেজের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে পুনর্বিমা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব এবং বিনিয়োগ পোর্টফোলিও থেকে ভালো রিটার্ন আসায় সামগ্রিক খাতে ইতিবাচক হাওয়া বইছে। প্রথম অর্ধে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৭টি কোম্পানি নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যার মধ্যে ১১টি কোম্পানি পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ৯টি কোম্পানি এ সময়ে লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে।
বিমা খাতের সামগ্রিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বেশ কিছু প্রধান কোম্পানির পারফরম্যান্সে বড় ধরনের তারতম্য লক্ষ করা যায়। ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে শীর্ষ কয়েকটি বিমা কোম্পানির পারফরম্যান্স নিচে তুলে ধরা হলো:
| কোম্পানির নাম | নিট মুনাফা/খাত (২০২৬ এর ১ম অর্ধ) | পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় পরিবর্তন (%) | প্রধান চালিকাশক্তি ও মন্তব্য |
| বুপা আরবিয়া (Bupa Arabia) | ৬৯৪.০৮ মিলিয়ন রিয়াল | +৪.১৪% | বিমা সেবার সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ রিটার্ন বৃদ্ধি |
| তাওয়ুনিয়া (Tawuniya) | ৬০৯.৮৫ মিলিয়ন রিয়াল | -১৬.৩৬% | ইঞ্জিনিয়ারিং ও জ্বালানি খাতে বড় দাবির কারণে খরচ বৃদ্ধি |
| আল রাজি তাকাফুল (Al Rajhi Takaful) | ২০৭.৮৪ মিলিয়ন রিয়াল | +২.৭% | মোটর, মেডিকেল বিমা ও ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম বৃদ্ধি |
| বিমা খাতের মোট মুনাফা (১ম অর্ধ) | ১.৮৭ বিলিয়ন রিয়াল | +২৪.৩% | সমন্বিত বিমা অপারেশন ও উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা |
| বিমা খাতের মোট মুনাফা (২য় ত্রৈমাসিক) | ৯২৩.৪৩ মিলিয়ন রিয়াল | +২৪.৮৭% | এপ্রিলেই ১৬টি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে মুনাফা করে |
| মুনাফা অর্জনকারী মোট কোম্পানি | ১৭টি কোম্পানি | — | এর মধ্যে ১১টি কোম্পানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে |
| লোকসানকারী মোট কোম্পানি | ৯টি কোম্পানি | — | অপারেশনাল খরচের চাপে কিছু কোম্পানি লোকসানে |
| ২য় ত্রৈমাসিকে লাভজনক কোম্পানি | ১৬টি কোম্পানি | — | ১১টি কোম্পানি আগের বছরের একই ত্রৈমাসিককে ছাড়ায় |
| স্বাস্থ্য বিমা খাত | প্রধান প্রবৃদ্ধি খাত | — | দাবি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রিমিয়াম আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে |
| মোটর বিমা খাত | প্রধান প্রবৃদ্ধি খাত | — | বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ত্বরান্বিত |
দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকেই (এপ্রিল-জুন) সৌদি বিমা খাত থেকে আয় এসেছে ৯২৩.৪৩ মিলিয়ন রিয়াল, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের (৭৩৯.৫ মিলিয়ন রিয়াল) তুলনায় প্রায় ২৪.৮৭ শতাংশ বেশি। কেবল কয়েকটি বড় কোম্পানির ওপর ভিত্তি করেই এই খাতের সূচক বড় লাফ দিয়েছে। এর মধ্যে বুপা আরাবিয়া সর্বোচ্চ ৬৯৪.০৮ মিলিয়ন রিয়াল মুনাফা করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তাওউনিয়া ৬০৯.৮৫ মিলিয়ন রিয়াল আয় করলেও ইঞ্জিনিয়ারিং ও এনার্জি খাতের বড় কিছু বিমা দাবির কারণে তাদের মুনাফা ১৬.৩৬ শতাংশ কমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আল রাজি তাকাফুল ২০৭.৮৪ মিলিয়ন রিয়াল নিট মুনাফা করেছে।
সৌদি ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তথা প্রখ্যাত অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. সুলেইমান আল-হুমাইদ আল-খালিদি আশারক আল-আওসাতকে জানান, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে বিমা কোম্পানিগুলোর এই ২৪.৩ শতাংশ মুনাফা বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে খাতটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ড. খালিদির মতে, এই ইতিবাচক রূপান্তরের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিমা সেবার মান নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বিমা দাবি (Claims) ও অপারেশনাল খরচ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা—যা আয় বৃদ্ধির চেয়ে টেকসই মুনাফার ওপর বেশি জোর দেয়। তৃতীয়ত, দেশটির অনুকূল আর্থিক পরিবেশের কারণে বিমা কোম্পানিগুলোর মূলধনি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই উন্নতির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো বিমা কোম্পানিগুলোর এই মুনাফা কেবল কোনো অ-পরিচালন আয় বা অস্থিতিশীল বিনিয়োগ নির্ভর নয়, বরং এটি সরাসরি মূল বিমা অপারেশনের গুণগত মান থেকেই এসেছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই বিশেষজ্ঞ।
তবে বিমা খাতের এই অগ্রযাত্রার সামনে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা: বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিমায় আকস্মিক দাবি বৃদ্ধি, বাজার দখলের প্রতিযোগিতা নিয়ে বিমার প্রিমিয়ামে অসম দর কষাকষি এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ রিটার্নের ওঠানামা। আগামী দিনগুলোতে শুধু প্রিমিয়াম বাড়ানো কোম্পানিগুলো নয়, বরং যারা খরচ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রিটার্নের সমীকরণ মেলাতে পারবে, তারাই বাজারে টিকে থাকবে।


