টেস্ট ক্রিকেটে নো বলের সমস্যা কমাতে ফ্রি হিট চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের স্পিন বোলিং কোচ সাইরাজ বাহুতুলে। তবে সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার সেই মতের সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, টেস্ট ক্রিকেটে নো বলের শাস্তি হিসেবে ফ্রি হিট চালু করা হলে বরং ব্যাটসম্যানদের আরও সহজে রান করার সুযোগ তৈরি হবে। এর পরিবর্তে নিয়ম ভাঙা বোলারকে আর্থিক জরিমানা করার পাশাপাশি বোলিং কোচকেও শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় বোলারদের সাম্প্রতিক নো বলের প্রবণতা নিয়ে নিজের কলামে এই মতামত তুলে ধরেছেন গাভাস্কার। তাঁর দৃষ্টিতে, টেস্ট ক্রিকেটে একটি নো বল শুধু একটি অতিরিক্ত রান দেওয়ার ঘটনা নয়; ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। বিশেষ করে কোনো ব্যাটসম্যানকে আউট করার পর নো বল ধরা পড়লে সেই উইকেট বাতিল হয়ে যায়। ফলে একটি ছোট ভুল কখনো কখনো পুরো ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সম্প্রতি শেষ হওয়া দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ভারতের বোলারদের নো বল করার প্রবণতা বেশ স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে রবীন্দ্র জাদেজা ও অভিষিক্ত সারাংশ জৈনের বোলিংয়ে এই ভুল বেশি দেখা গেছে। দ্বিতীয় টেস্টে ভারতীয় বোলাররা মোট ১৩টি নো বল করেন। এর মধ্যে দুই ইনিংস মিলিয়ে জাদেজা ও সারাংশ জৈনের নো বল ছিল ১১টি।
প্রথম টেস্টে জাদেজা চারটি নো বল করেন। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে তাঁর নো বল ছিল তিনটি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে আরও একটি। সব মিলিয়ে ২০২১ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেটে জাদেজার নো বলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮টি। একই সময়ে টেস্টে নো বল করা স্পিনারদের তালিকায় তাঁর পরেই রয়েছেন পাকিস্তানের নোমান আলী, যার সংখ্যা ৪০। শ্রীলঙ্কার লাসিথ এম্বুলদেনিয়া করেছেন ৩৩টি এবং ইংল্যান্ডের জ্যাক লিচের নো বল ১৯টি।
এই পরিসংখ্যানই গাভাস্কারের উদ্বেগের মূল কারণ। তবে নো বলের প্রতিকার হিসেবে ফ্রি হিট চালুর ধারণাকে তিনি সমস্যার কার্যকর সমাধান মনে করছেন না। তাঁর যুক্তি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ফ্রি হিট নো বলের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর শাস্তি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও টেস্ট ক্রিকেটের চরিত্র আলাদা। সেখানে ব্যাটসম্যানকে এমন অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হলে বোলারের ভুলের শাস্তি আরও বড় হয়ে যেতে পারে।
গাভাস্কারের মতে, টেস্ট ক্রিকেটে এমনিতেই ব্যাটসম্যানদের রান করার সুযোগ কিছুটা বেড়েছে। ওভারে বাউন্সারের সংখ্যা সীমিত করা এবং মাঠের সীমানা ছোট করার মতো পরিবর্তন ব্যাটিংকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক করেছে। এর সঙ্গে নো বলের পর ফ্রি হিট যোগ হলে বোলারদের একটি ভুল থেকে ব্যাটিং দলের বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাই তিনি ভিন্ন ধরনের শাস্তির কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম নো বলের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই বোলার পরবর্তীবার আবার নো বল করলে সেই জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। অর্থাৎ একই ভুল বারবার করলে আর্থিক শাস্তিও ধাপে ধাপে বাড়বে।
গাভাস্কারের প্রস্তাবের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বোলিং কোচকেও এর আওতায় আনা। তাঁর মতে, বোলারের জরিমানার অর্ধেক পরিমাণ বোলিং কোচকেও দিতে হতে পারে। এতে শুধু বোলার নয়, কোচিং ব্যবস্থার মধ্যেও নো বল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি অবশ্য নো বলেই শাস্তির ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। ফিল্ডিংয়ের সময় থ্রোর পেছনে যথাযথভাবে ব্যাকআপ না নেওয়া, কিংবা দলের ক্ষতি করতে পারে এমন অন্য অসতর্কতার ক্ষেত্রেও জরিমানা চালুর কথা বলেছেন। কোন ধরনের ভুল শাস্তিযোগ্য হবে, সেটি দলের খেলোয়াড়েরা সম্মিলিতভাবে ভোটের মাধ্যমে ঠিক করতে পারেন বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
গাভাস্কারের প্রস্তাবের একটি মানবিক দিকও রয়েছে। তাঁর পরামর্শ, জরিমানা থেকে আদায় করা অর্থ দলের কোনো বিশেষ আয় হিসেবে জমা না রেখে খেলোয়াড়দের বিদায়ের আগে শেষ নৈশভোজের মতো দলীয় আয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে শাস্তির পাশাপাশি দলের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতাও তৈরি হতে পারে।
টেস্ট ক্রিকেটে নো বল কমানোর মূল লক্ষ্য অবশ্য শুধু জরিমানা আদায় নয়। বোলারের রানআপ, ক্রিজের অবস্থান, অনুশীলনের ধরন এবং ম্যাচের চাপের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অভিজ্ঞ বোলারদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভুল বারবার হলে তা নিয়ন্ত্রণে দলীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। গাভাস্কারের প্রস্তাব সেই দায়বদ্ধতাকেই আরও দৃঢ় করার একটি ভিন্নধর্মী উপায় হিসেবে সামনে এসেছে।


