সাকিব-তামিমের দূরত্ব নিয়ে মুখ খুললেন সুজন

একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের বন্ধুত্ব ছিল বেশ আলোচিত। জাতীয় দলের সতীর্থ হিসেবে মাঠে যেমন একসঙ্গে লড়েছেন, মাঠের বাইরেও তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আড্ডা, গল্প কিংবা দলের নানা কর্মকাণ্ডে তাদের একসঙ্গে দেখা যেত নিয়মিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়। একপর্যায়ে দুজনের দূরত্ব এতটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ক্রিকেট মহলে তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।

তবে সাকিব ও তামিমের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রকৃত কারণ কখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি। দুজনই বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পেশাদারিত্বের জায়গাটি সামনে রেখেছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় যেন জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব না ফেলে।

সাকিব-তামিমের সম্পর্কের পরিবর্তন প্রথম দিকে কীভাবে দেখেছিলেন দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা খালেদ মাহমুদ সুজন? সম্প্রতি সেই অভিজ্ঞতার কথাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক ও তৎকালীন টিম ডিরেক্টর।

সুজন জানান, শুরুতে বিষয়টি তার কাছে সহজে ধরা পড়েনি। কারণ, তিনি সাকিব ও তামিমকে দীর্ঘদিন ধরে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার চোখে তারা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

সুজনের ভাষায়, ‘এটা প্রথমে আসলে বুঝতে পারতাম না। আমরা যতটা চিনি ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড। সবসময় একসঙ্গে থাকা, আড্ডা, গল্পগুজব করা।’

পরে দুজনের মধ্যে দূরত্বের বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি সরাসরি সাকিব ও তামিমের সঙ্গে কথা বলেন। তবে তাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করতে চাননি। বরং জাতীয় দলের স্বার্থে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য যেন মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব না ফেলে, সেটিই ছিল তার মূল উদ্বেগ।

সুজন বলেন, ‘একদিন আমি তাদের দুজনের সাথেই বসলাম। তখন শুনলাম ওদের মধ্যে… এটা ওদের পারসোনাল লাইফ হতে পারে। তবে দুজনকেই অনুরোধ করেছিলাম, দল ও দেশের স্বার্থে এটা যেন বাইরে না যায়।’

তার মতে, জাতীয় দলের দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে জোর করে কোনো সিদ্ধান্তে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। তারা দুজনই পরিণত এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থানে ছিলেন।

সুজন বলেন, ‘ওরা তো বাচ্চা নয়। কেউ কাউকে এভয়েড করলে আমি তো জোর করতে পারব না। অনূর্ধ্ব-১৮ দলের বাচ্চাদের বলতে পারি—এটা করো, ওটা করো না। জাতীয় দলের হয়ে খেলছে, এত বড়, তাদের তো এসব বলা যায় না।’

সাকিব-তামিমের সম্পর্কের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ও দল নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন বক্তব্য প্রকাশ্যে আসায় দলের ভেতরের কিছু বিষয় নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা শুরু হয়। এতে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সেই সময় প্রকাশ্যে ড্রেসিংরুমের অভ্যন্তরীণ বিষয় চলে আসায় অস্বস্তি বোধ করেছিলেন সুজন। তার কাছে দলের ড্রেসিংরুম ছিল পরিবারের মতো, যেখানে ভেতরের আলোচনা বাইরে না যাওয়াই স্বাভাবিক পেশাদার সংস্কৃতির অংশ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৩ বিশ্বকাপের আগে সাকিব প্রথম যখন কথাটা বলল, একটু মনে হয় ইয়ে ছিল। পাবলিকলি বলা… ড্রেসিংরুমের কথা কেন বাইরে যাবে? এটা আমার একদম পছন্দ না। ড্রেসিংরুম আমার জন্য পরিবার। সেখানকার কথা হলো পারিবারিক কথা।’

তবে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে গিয়ে পুরোনো বিরোধ বা ব্যক্তিগত দূরত্বকে সামনে না রাখার চেষ্টা করেছিলেন দলের সংশ্লিষ্টরা। সুজনও চেয়েছিলেন, সফরে যাওয়ার পর এসব আলোচনা যেন আর দলের মনোযোগ নষ্ট না করে।

তার ভাষায়, ‘ট্যুরে যাওয়ার পর এই কথাই তুলিনি। আমি বলেছিলাম, এটা নিয়ে যেন কোনো কথা না ওঠে।’

জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে পেশাদারিত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই মনে করেন সুজন। দলের ভেতরে সাকিবের সমর্থক যেমন থাকতে পারেন, তামিমেরও থাকতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একাদশে জায়গা পাওয়ার মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত পারফরম্যান্স।

সুজনের বক্তব্য, ‘দলে সাকিবের ভক্ত থাকতেই পারে, তামিমের ভক্ত থাকতেই পারে। তবে পেশাদারিত্ব এসবের অনেক ওপরে। যতই ফ্যান হন, আপনি পারফর্ম না করলে সাকিব-তামিম আপনাকে দলে জায়গা দিতে পারবে না।’

সাকিব ও তামিমের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সুজনের ধারণা, তাদের ব্যক্তিগত দূরত্ব জাতীয় দলের ফলাফলের সরাসরি কারণ ছিল না। মাঠে নামার পর প্রত্যেক ক্রিকেটারের দায়িত্ব নিজের জায়গা থেকে পারফর্ম করা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ যেমনই হোক, জাতীয় দলের জার্সিতে দায়িত্বের জায়গায় কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে সুজন বলেন, ‘তবে সাকিব-তামিমের সঙ্গে আমি এক জায়গায় একমত, তাদের দূরত্বের কারণে দলের রেজাল্ট খারাপ হয়নি। দিনশেষে সবাই চায় পারফর্ম করতে।’

তার বক্তব্যে উঠে আসে জাতীয় দলের ক্রিকেটের বাস্তবতাটিও। এটি কোনো স্থানীয় বা পাড়ার দল নয়, যেখানে ব্যক্তিগত অভিমান থেকে কেউ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব, নিজের ক্যারিয়ার, সম্মান এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ।

সুজনের ভাষায়, ‘এটা পাড়ার দল না যে রাগ করে বলবে আজ ব্যাটিং করব না। এটা আপনার রুটি-রুজি, সম্মান, গৌরব। পারফর্ম করতেই হবে। এখানে কোনো ছাড় ছিল না।’

সাকিব ও তামিমের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাংলাদেশের ক্রিকেটের আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিস্তারিত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও, দলের ভেতরে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই বারবার সামনে এসেছে। সুজনের বক্তব্যেও সেই বিষয়টিই স্পষ্ট—ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো না থাকলেও জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্বের বিকল্প নেই।

দীর্ঘদিনের সতীর্থদের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে বাইরে যত আলোচনা থাকুক, মাঠে একজন ক্রিকেটারের আসল পরিচয় তার পারফরম্যান্সেই। আর জাতীয় দলের ক্ষেত্রে সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের প্রত্যাশা ও মর্যাদা। সাকিব-তামিমের ঘটনাকে ঘিরে সুজনের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তাই সম্ভবত এটিই—ব্যক্তিগত দূরত্ব থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় দলের দায়িত্বের জায়গায় তার প্রভাব পড়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।