কুড়িগ্রামে সরকারি সার বিতরণকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় চাষিদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। জেলা কৃষি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সার সংকট নেই বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্রে উল্টো দৃশ্য ফুটে উঠেছে। প্রান্তিক ডিলার পয়েন্টে দিনের পর দিন ঘুরেও সার না পেয়ে অসন্তোষ বাড়ছে কৃষকদের মাঝে। এর জেরে ডিলারের গুদাম লুটপাট, সড়ক অবরোধ এবং কৃষি কর্মকর্তাদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো জেলায় এক নজিরবিহীন অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া না গেলেও খুচরা বাজারে চড়া দামে তা অনায়াসে মিলছে। মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এই ক্ষোভের জের ধরে সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে অবরুদ্ধ ও মারধরের শিকার হয়েছেন কর্মকর্তারা। ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী, উলিপুর ও রাজীবপুরে ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার অতিরিক্ত এক হাজার টন সার বরাদ্দ দিয়েছে, তবুও মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ কমেনি।
সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নে সার বিতরণকালে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মামুন অর রশিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে সদর থানায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে কৃষি বিভাগ। সদর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও একাধিক স্থানে একই ধরনের সহিংস চিত্র দেখা গেছে। উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুর বাজারে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা, যার ফলে কুড়িগ্রাম-চিলমারী আঞ্চলিক সড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুল আলমের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় দুই কৃষক—আল আমিন ও সুরুজ মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হলেও বাকি ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাত আসামি পুলিশের ভয়ে এখন গ্রামছাড়া। যদিও ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, তারা কেবল ন্যায়সংগত দাবির স্বার্থে বিক্ষোভ করেছিলেন, কোনো কর্মকর্তার ওপর শারীরিক আক্রমণ চালাননি।
একইভাবে নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারে সার না পেয়ে কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে দীর্ঘ সময় গুদামে আটকে রাখেন ক্ষুব্ধ জনতা। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলিশ সাথে নিয়ে চার ঘণ্টা পর তাঁকে উদ্ধার করেন। উলিপুরের বজরা ইউনিয়নেও একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে আধঘণ্টা দোকানে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতির সার্বিক অবনতিতে চরম আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন। সরকারি দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তা ও প্রাণহানির আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কাজ করা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ কৃষকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত চলছে এবং নিরপরাধ কোনো চাষির আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।


