স্মরণে—শিক্ষাবিদ, কবি, গীতিকার ও অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল

অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে

—আবু হেনা মোস্তফা কামাল

বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভার দীপ্ত নাম। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্যসমালোচক, অধ্যাপক, গায়ক, বাগ্মী এবং টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক। মাত্র ৫৩ বছরের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা আজও উজ্জ্বল ও স্মরণীয়।

১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ পাবনা জেলার গোবিন্দা গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা এম. শাহজাহান আলী ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।

১৯৫২ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৫৯ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকাকে ঘিরে যে নতুন সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহ তৈরি হয়েছিল, আবু হেনা ছিলেন সেই নবীন সাংস্কৃতিক পরিসরের অন্যতম সক্রিয় মুখ। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর কবিসত্তা ও সংগীতপ্রতিভার পরিচয় প্রকাশ পায়। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর সহযোগে ১৯৫৪ সালে প্রকাশ করেন ‘পূর্ব বাংলার কবিতা’—যা তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক নিদর্শন।

তরুণ বয়সেই তিনি কবি ও গীতিকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বন্ধু আবু বকর খান, আনোয়ারউদ্দিন খান ও মো. আসফদ্দৌলার সঙ্গে আধুনিক গানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছিলেন তিনি। আবু বকর খানের কণ্ঠে জনপ্রিয় ‘সেই চম্পা নদীর তীরে’ তাঁরই লেখা। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

তাঁর গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সহজ অথচ কাব্যময় ভাষা, প্রেমের নিবিড় অনুভব, প্রকৃতির সৌন্দর্য, বিরহের মৃদু বিষণ্নতা এবং জীবনের প্রতি গভীর মমতা।
‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান’, ‘নদীর মাঝি বলে’, ‘এই বাংলার হিজল তমালে’, ‘অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে সেদিন বর্ণমালা’—তাঁর বহু গান আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে অমলিন।

বিশেষ করে—

“অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে,
যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে—
তুমি এলে।”

এই পংক্তিগুলোর মতোই তাঁর গানেও বারবার ফিরে এসেছে মেঘ-বৃষ্টি, আলো-আঁধারি, অপেক্ষা, প্রেম ও প্রত্যাশার অপূর্ব মেলবন্ধন।

শুধু গীতিকার হিসেবে নয়, কবি হিসেবেও আবু হেনা ছিলেন স্বতন্ত্র স্বরের অধিকারী। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আপন যৌবন বৈরী’ (১৯৭৪), ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪) এবং ‘আক্রান্ত গজল’ (১৯৮৮)। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগৎ, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, সময় ও সমাজচেতনা এক নিজস্ব শিল্পরূপ পেয়েছে।

গদ্য ও গবেষণাচর্চাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শিল্পীর রূপান্তর’, ‘কথা ও কবিতা’ এবং তাঁর পিএইচডি গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত The Bengali Press and Literary Writing, 1818–1831। বাংলা সাহিত্য, সাহিত্যিক ও সাহিত্য-সমালোচনা নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলোতে ছিল গভীর পাঠ, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, রসবোধ এবং ভাষার অসাধারণ সৌকর্য।

কর্মজীবনে কলেজের শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। ১৯৬২ সালে জনসংযোগ পরিদপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার হন। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং বাংলা সংবাদপত্র ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫), সুহৃদ সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭) এবং *আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্বর্ণপদক (১৯৮৯)*সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।

আবু হেনা মোস্তফা কামালের জীবন ছিল স্বল্পায়ু, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির পরিসর ছিল বিস্তৃত। তিনি যেমন বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি আধুনিক বাংলা গানের কথাকে দিয়েছেন নতুন মাধুর্য। তাঁর গানে প্রেম এসেছে নির্মল অনুভবে, প্রকৃতি এসেছে চিত্রময়তায়, আর মানুষের অন্তর্গত আবেগ পেয়েছে সহজ ও সুরেলা ভাষা।

তিনি চলে গেছেন বহু বছর আগে—কিন্তু তাঁর গান এখনো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, কোনো পুরোনো স্মৃতির অলিন্দে কিংবা নিঃশব্দ ভালোবাসার মুহূর্তে হঠাৎ ফিরে আসে। মনে হয়, দূর কোনো অদৃশ্য বেতার তরঙ্গ পেরিয়ে আবার ভেসে আসছে তাঁরই সেই চিরচেনা উচ্চারণ—

“অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে,
যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে…”

১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে নেমে এসেছিল গভীর শূন্যতা। কিন্তু প্রকৃত শিল্পীর মতোই তিনি তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আজও বেঁচে আছেন—গানে, কবিতায়, শব্দে, স্মৃতিতে এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক অনুভবে।

২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বহুমাত্রিক এই শিল্পী ও মননশীল মানুষটির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণাঞ্জলি।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।