সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মদের ৪ গুদাম সিলগালা

‘অননুমোদিত’ গুদামে শুল্কমুক্ত মদ সংরক্ষণের অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চারটি গুদাম সিলগালা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানে চালানো যৌথ অভিযানে দুটি অনুমোদিত এবং দুটি অননুমোদিত গুদাম সিল করা হয়।

এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) যৌথভাবে অভিযানটি পরিচালনা করে। প্রাথমিক পরিদর্শনে ‘গুরুতর অসংগতি’ পাওয়ার পর বিস্তারিত যাচাই ও তদন্তের স্বার্থে চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অভিযান শুরু হয়ে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে। অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটির গুদামগুলোতে থাকা পণ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হয়।

শুল্কমুক্ত মদ বিক্রির অভিযোগ

কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্ডেড ওয়্যারহাউজে আমদানি করা শুল্কমুক্ত মদ সাধারণ খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং আইনে নির্ধারিত বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিরাই বিধি অনুযায়ী এসব পণ্য কেনার সুবিধা পান।

তবে টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে অনুসন্ধান চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত বা ঘোষিত গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু অভিযানে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুতের তথ্য পাওয়া যায়। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য অনুমোদনহীন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই সব গুদাম সিলগালা করা হয়েছে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুদামগুলোর পণ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এনবিআর জানিয়েছে, যাচাই ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশি নাগরিকত্ব ও আর্থিক লেনদেনও তদন্তে

নুর ইসলাম ও তার পরিবারের ব্যবসা এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও কর-গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আলাদাভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকে পাওয়া তথ্যও পর্যালোচনা করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কানাডা থেকে সংগ্রহ করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নাগরিকত্ব এবং সেখানে ব্যবসায়িক মালিকানা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য রয়েছে। ঢাকার টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং মেয়ে তাসনিম ইসলামের নামও ওই অনুসন্ধানে এসেছে।

২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের আর্থিক কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ সময়ের মোট ১৬৩টি আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথির সারাংশ অনুযায়ী, এসব প্রতিবেদনের মধ্যে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেন, দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টা, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনসংক্রান্ত ১১৮টি প্রতিবেদন, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্কের (ইএফটিএন) মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের ২৬টি প্রতিবেদন এবং আন্তদেশীয় অর্থ লেনদেনের দুটি নথি রয়েছে। এ ছাড়া এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আনার তথ্যও তদন্তে এসেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে এসব লেনদেনের প্রকৃতি, বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া হয়নি। তদন্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

সালমানের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, টস বন্ডের বিরুদ্ধে অভিযানটি সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক স্টুডিওতে হামলার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাঁদের দাবি, শুল্ক, ভ্যাট ও আয়করসংক্রান্ত অনুসন্ধান আগে থেকেই চলছিল।

সিআইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, সালমান মুক্তাদির এ তদন্তের মূল বিষয় নন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকেই নুর ইসলাম ও তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে কাজ করছিল। অনুসন্ধানে কিছু তথ্য পাওয়ার পর এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও যাচাই করা হচ্ছে।

আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের একজন কর্মকর্তাও জানান, নুর ইসলামের একাধিক ব্যবসা রয়েছে। তাঁর বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও মদ ব্যবসার পাশাপাশি পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য পাওয়া যাওয়ার পর কর-সংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা শুরু হয়।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু আয়করের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ডেড ওয়্যারহাউজের পণ্য আমদানি, শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

স্টুডিওতে হামলার পর ব্যাংক হিসাব তলব

এর মধ্যে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে সালমান মুক্তাদির হামলার জন্য বিএনপির চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছিলেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে বিভিন্ন মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে সরে আসেন।

অন্যদিকে নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া করা মামলায় হামলার কারণ হিসেবে জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম রয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানও রয়েছেন।

এরই মধ্যে বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ফলে একদিকে স্টুডিওতে হামলার তদন্ত এবং অন্যদিকে তাঁর শ্বশুরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে চলমান শুল্ক, কর ও আর্থিক অনুসন্ধান—দুটি পৃথক বিষয়ই এখন আইনশৃঙ্খলা ও আর্থিক তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।