সুরের জাদুতে আজও বেঁচে আছেন ভূপেন হাজারিকা

উপমহাদেশের সংগীতাকাশে ভূপেন হাজারিকা এমন এক নাম, যিনি শুধুই সুরের যাদুকর ছিলেন না, ছিলেন এক দূরদর্শী মানবতাবাদী বার্তা বাহক। কণ্ঠের অনন্য গম্ভীরতা, কবিতার মতো ধারালো লিরিক এবং লোকজ সুরের মেলবন্ধনে তিনি যুগের পর যুগ ধরে মানুষের হৃদয় জয় করে চলেছেন। আসামের বহমান ব্রহ্মপুত্র নদীর মতো তাঁর সৃষ্টিও আছড়ে পড়েছে সীমানা পেরিয়ে—বাংলা, হিন্দি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। ভূপেন হাজারিকার গান কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং ভালোবাসার শক্তিশালী হাতিয়ার।
১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সদিয়া অঞ্চলের এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নেন এই কিংবদন্তি। মায়ের মুখে শোনা আসামের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ও ঘুমপাড়ানি গান তাঁর শিশু মনে সুরের বীজ বুনে দিয়েছিল। মাত্র ১০ বছর বয়সে জনসম্মুখে গান গেয়ে তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের চমকে দেন। এরপর ১৯৩৯ সালে, মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘ইন্দ্রমালতী’ নামের অসমিয়া চলচ্চিত্রে গান গেয়ে চলচ্চিত্রের বিশাল জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে পদার্পণ করেন।
পড়াশোনাতেও তিনি ছিলেন সমান মেধাবী। গুয়াহাটির ঐতিহ্যবাহী কটন কলেজ এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালেই তাঁর জীবনের এক বড় পরিবর্তন আসে। সেখানে বিখ্যাত আফ্রো-আমেরিকান সংগীতশিল্পী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনকর্মী পল রোবসনের সাথে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। রোবসনের গান ও সামাজিক লড়াই ভূপেন হাজারিকাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তীতে নিজ দেশে ফিরে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সাথে নিজেকে যুক্ত করেন এবং গানকে গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।
তাঁর কণ্ঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি শুধু একটি সুর নয়, বরং বিশ্ব মানবতার এক সার্বজনীন আবেদন। এই গানটি বাংলা ভাষায় গাওয়ার পর বাংলাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিল। একইভাবে ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’, ‘মই এটি যাযাবৰ’ কিংবা ‘গংগা মোৰ মা’-এর মতো সৃষ্টিগুলো তাঁকে অমর করে রেখেছে। গায়ক, গীতিকার ও সুরকারের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯৭৫ সালে ‘চামেলি মেমসাব’ চলচ্চিত্রের সুরসংযোজনের জন্য তিনি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। পরবর্তীতে ‘রুদালি’, ‘এক পল’ ও ‘দমন’-এর মতো হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সৃষ্টি করা সুর ভারতজুড়ে আলোড়ন তোলে। বিশেষ করে ‘রুদালি’ ছায়াছবির ‘দিল হুম হুম করে’ গানটি আজও শ্রোতাদের চোখে জল আনে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক অবদান চিরস্মরণীয়। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই সুরসাধকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। দেহাবসান হলেও তাঁর সুরের মায়া আজও এতটুকু কমেনি; বরং প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে।
নিচে ভূপেন হাজারিকার বর্ণাঢ্য জীবন, অর্জন এবং বিভিন্ন সৃষ্টি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
বিষয়/বিভাগ বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ
জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ (সদিয়া, আসাম, ভারত)
মৃত্যু ৫ নভেম্বর ২০১১ (মুম্বাই, মহারাষ্ট্র, ভারত)
শিক্ষা কটন কলেজ, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (পিএইচডি)
প্রথম চলচ্চিত্রে গান ১৯৩৯ সালে অসমিয়া চলচ্চিত্র ‘ইন্দ্রমালতী’
উল্লেখযোগ্য গান মানুষ মানুষের জন্য, বিস্তীর্ণ দুপারে, মই এটি যাযাবৰ, গংগা মোৰ মা, দিল হুম হুম করে
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র চামেলি মেমসাব, এক পল, রুদালি, দমন
উপাধি/খ্যাতি ব্রহ্মপুত্রের কবি (Bard of the Brahmaputra)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৭৫ সাল (‘চামেলি মেমসাব’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক)
বেসামরিক সম্মাননা (ভারত) পদ্মশ্রী (১৯৭৭), পদ্মভূষণ (২০০১), পদ্মবিভূষণ (২০১২, মরণোত্তর)
সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্ন (২০১৯, মরণোত্তর) ও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২)
বাংলাদেশের স্বীকৃতি ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার (২০১১)
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।