এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আজ ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল। শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের পুরোটা দিয়ে লড়াই করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে চায় নিগার সুলতানা জ্যোতির দল।
দেশ ছাড়ার আগে এবারের আসরে সেমিফাইনালে খেলার লক্ষ্য জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। গ্রুপপর্বে সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে দল। শেষ ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৩৪ রানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এখন সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ ভারত, যারা নারী ক্রিকেটে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল।
বাংলাদেশের জন্য এবারের সেমিফাইনাল শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, সাম্প্রতিক ব্যর্থতার হিসাব মেলানোরও সুযোগ। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে জ্যোতির দল। আগের আসরেও শেষ চারে ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সেই ম্যাচে ১০ উইকেটে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
এবার সেই ফলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না বাংলাদেশের মেয়েরা। বরং ভারতের বিপক্ষে নিজেদের সেরা ক্রিকেট উপহার দেওয়াই লক্ষ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ শেষে নিগার সুলতানা জ্যোতি বলেন, ‘ভারত খুবই শক্তিশালী দল। আমরা তাদের বিপক্ষে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলার চেষ্টা করবো। ফল তো একটা আসবেই। কিন্তু নিজেদের পুরোটা উজাড় করে দিতে হবে।’
অধিনায়কের কথায় ম্যাচটির বাস্তবতা পরিষ্কার। ভারতের বিপক্ষে জিততে হলে শুধু ভালো ক্রিকেট খেললেই হবে না, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে। ব্যাটিং-বোলিংয়ের পাশাপাশি চাপ সামলানোর দক্ষতাও বড় ভূমিকা রাখবে।
আত্মবিশ্বাসী শারমিন
আরব আমিরাতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সর্বোচ্চ ৩৮ রান করেছিলেন শারমিন আক্তার সুপ্তা। ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার আগে তার কথাতেও আত্মবিশ্বাসের ছাপ রয়েছে।
শারমিন মনে করেন, ভারতের শক্তি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করলে সেটিই চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বরং এমন দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগকে উপভোগ করাই উচিত।
তার ভাষায়, ‘আপনি নেতিবাচক ভাবতে থাকলে এটা চাপ হতে পারে। কিন্তু ভারতের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে পারাটা আমাদের জন্য আনন্দের। আপনি যদি চ্যাম্পিয়ন হতে চান, তাহলে এমন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আপনাকে খেলতেই হবে। তাদের বিপক্ষে খেলাটাকে আমরা চাপ নয়, বরং উপভোগ করি।’
এই মানসিকতাই সেমিফাইনালে বাংলাদেশের বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ভারতের বিপক্ষে শুরু থেকেই নিজেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করলে স্বাভাবিক খেলাটা কঠিন হয়ে যেতে পারে। বরং নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বল হাতে বড় ভরসা মারুফা
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে ভারতের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারেন পেসার মারুফা আক্তার। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তিন ম্যাচে সাত উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই ডানহাতি পেসার।
নতুন বলে তার গতি ও সুইং ভারতের টপ অর্ডারকে চাপে ফেলতে পারে। তবে শুধু মারুফার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে বাংলাদেশের বোলারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে শুরুতে উইকেট তুলে নিতে পারলে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের সমীকরণ অনেকটাই সহজ হয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে ভারতের ব্যাটাররা যদি শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের বোলারদের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়বে।
ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা
এশিয়া কাপে বাংলাদেশের নারী দলের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য এসেছিল ২০১৮ সালে। সেবার ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে মাত্র ৩ উইকেটে জয় পেয়েছিল সালমা খাতুনের নেতৃত্বাধীন দল।
সেই ঐতিহাসিক সাফল্য বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল। ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের সেই স্মৃতি আজকের সেমিফাইনালের আগে জ্যোতিদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হতে পারে।
তবে ইতিহাসের সাফল্য মাঠে কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। আজকের ম্যাচে নতুন করে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশকে। ভারতের বর্তমান শক্তি, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স—সবকিছুর ওপর নির্ভর করবে ফল।
বাংলাদেশের লক্ষ্য তাই পরিষ্কার—শুরু থেকেই লড়াইয়ে থাকা, সুযোগ কাজে লাগানো এবং শেষ পর্যন্ত ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা। প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, শিরোপা জিততে হলে এমন বাধা পেরোতেই হবে।
আজকের ম্যাচে সেই মানসিকতাই নিয়ে মাঠে নামতে চান নিগার সুলতানা জ্যোতি ও তার সতীর্থরা। একদিকে গত আসরের ১০ উইকেটের পরাজয়ের স্মৃতি, অন্যদিকে ২০১৮ সালের ফাইনালে ভারতকে হারানোর ইতিহাস। দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন নতুন গল্প লেখার অপেক্ষায়।


