খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
মুঘল ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নারী চরিত্রগুলোর অন্যতম সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। জন্মসূত্রে তাঁর নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে ‘নূরজাহান’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ—জগতের আলো। ইতিহাসের পাতায় তিনি শুধু এক সম্রাজ্ঞী হিসেবেই নন, বরং একজন দক্ষ শাসক, রাজনৈতিক কৌশলী, সাহসী নারী ও সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
১৫৭৭ সালের ৩১ মে এক সম্ভ্রান্ত পারস্য পরিবারে তাঁর জন্ম। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পরিবারটি ভারতে এসে আশ্রয় লাভ করে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে। সেখানেই রাজপ্রাসাদের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন মেহেরুন্নিসা। নাচ, গান, সাহিত্য, চিত্রকলা ও বিভিন্ন জ্ঞানচর্চায় তিনি অল্প বয়সেই অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।
রূপ ও গুণের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি ছিলেন অনন্যা। কিংবদন্তি আছে, যুবরাজ সেলিম (পরবর্তীকালের সম্রাট জাহাঙ্গীর) প্রথম দেখাতেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু সম্রাট আকবর রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে সেই সম্পর্ক মেনে নেননি। ফলে মেহেরুন্নিসার বিয়ে হয় আলি কুলি ইস্তাজলুর সঙ্গে, যিনি পরে ‘শের আফগান’ নামে পরিচিত হন।
সময়ের প্রবাহে আকবরের মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন যুবরাজ সেলিম, গ্রহণ করেন ‘জাহাঙ্গীর’ উপাধি। কিন্তু মেহেরুন্নিসার স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি। শের আফগানের মৃত্যুর পর মেহেরুন্নিসা আগ্রায় ফিরে আসেন এবং কয়েক বছর পর, ১৬১১ সালে, সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে বিয়ে করেন। তখনই তিনি লাভ করেন ‘নূরজাহান’ উপাধি।
বিয়ের পর শুধু সম্রাটের প্রিয়তমা হিসেবেই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি হয়ে ওঠেন এক অসাধারণ শক্তির উৎস। ইতিহাসবিদদের মতে, জাহাঙ্গীরের শাসনামলের একটি বড় অংশে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নূরজাহানের প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ইংরেজ দূত স্যার টমাস রো পর্যন্ত মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নূরজাহানের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
নূরজাহান ছিলেন সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। তিনি সম্রাটের সঙ্গে শিকারে অংশ নিতেন এবং দক্ষ বাঘ শিকারি হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর বীরত্ব ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সমকালীন কবি ও লেখকেরা বহু রচনা করেছেন।
রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ বিচক্ষণ। জাহাঙ্গীরের জীবনের শেষ দিকে যখন যুবরাজ খুররম (পরবর্তীকালের শাহজাহান) ও সেনাপতি মহাবত খাঁ বিদ্রোহ করেন, তখন নূরজাহান নিজেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা ও দৃঢ়তা মুঘল ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সম্রাট জাহাঙ্গীর নূরজাহানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসতেন। তিনি একবার বলেছিলেন—
“নূরজাহান আমার জীবনের মালিক, কিন্তু আমার ন্যায়বিচারের মালিক নন।”
এই উক্তিতেই তাদের সম্পর্কের গভীরতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বিষাদময়। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ কমে আসে। জীবনের বাকি সময় তিনি লাহোরে নিভৃতবাসে কাটান। অবশেষে ১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ৭২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নূরজাহান শুধু একজন সম্রাজ্ঞীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন কবিও। তাঁর সমাধিফলকে উৎকীর্ণ ফারসি কবিতার দুটি পঙ্ক্তি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত—
“গরিবের গোরে দীপ জ্বেলো না,
ফুল দিও না কেউ ভুলে;
শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখা,
দাগা না পায় বুলবুলে।”
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে নূরজাহান এক অনন্য নাম। সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা, সাহস, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বগুণে তিনি আজও ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নারী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।