দিকে দিকে জ্বলছে যে আজ অশনি সংকেত—
হে ‘অপরাজিত’ সাহিত্যস্রষ্টা,
বাংলা কথাসাহিত্যের নিভৃতচারী এই মহাজীবনকে আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি।
১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪—বাংলার প্রকৃতি, নদী, মাঠ, বন আর মানুষের সহজ-সরল জীবনকে যিনি একদিন তাঁর কলমে অমর করে তুলবেন, সেই বিভূতিভূষণের জন্ম হয়েছিল তৎকালীন চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরারিপুর গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে। পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিদ্বান সংস্কৃতপণ্ডিত; পাণ্ডিত্য ও কথকতার জন্য তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
শৈশব থেকেই প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, শিক্ষকতা, চাকরি ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছিল মাটির গন্ধ, মানুষের স্পন্দন এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক অপূর্ব আত্মিক সম্পর্ক। তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনা ঘটে ‘উপেক্ষিতা’ গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে; এরপর ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন এক অনন্য কথাশিল্পী হিসেবে।
তারপর ফুটলো ‘মৌরীফুল’,
বাজলো ‘মেঘমল্লার’,
বদলে গেল বাংলা কথাসাহিত্যের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি।
এলো ‘পথের পাঁচালী’—
অপুর চোখ দিয়ে আমরা দেখলাম বাংলার গ্রাম, দারিদ্র্য, স্বপ্ন, শৈশব, প্রকৃতি ও মানুষের বেঁচে থাকার অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
এলো ‘অপরাজিত’—
জীবনের পরাজয়ের ভেতর থেকেও যে মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে, সেই অদম্য মানবযাত্রার মহাকাব্য।
‘আরণ্যক’ আমাদের নিয়ে গেল অরণ্যের গভীর নির্জনতায়;
‘চাঁদের পাহাড়’ কিশোর-কিশোরীর কল্পনায় জ্বেলে দিল অজানাকে জানার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা;
‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর হাজারি ঠাকুর হয়ে উঠল সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদার প্রতীক;
‘বিপিনের সংসার’, ‘ইছামতী’, ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’, ‘দেবযান’—প্রতিটি রচনাই তাঁর বিস্ময়কর জীবনদৃষ্টি ও মানবিকতার আলাদা আলাদা দরজা খুলে দেয়।
আর শেষ জীবনের গভীর আর্তনাদ যেন ‘অশনি সংকেত’—
দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি, ক্ষুধার হাহাকার, মানুষের অসহায়ত্ব এবং সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতার এক অনিবার্য দলিল।
কালের নিরিখে বয়ে যায়
সময়-প্রবাহ।
মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।
সভ্যতা বদলে যায়, শহর বদলে যায়, নদীর গতিপথ বদলে যায়—
কিন্তু প্রকৃত সাহিত্য কখনও হারিয়ে যায় না।
আজও অস্থির, অশান্ত মহাপৃথিবীর দিকে দিকে যেন জ্বলছে সেই ‘অশনি সংকেত’।
আজও ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাসে, প্রকৃতির নিঃশব্দ কান্নায় আমরা খুঁজে পাই বিভূতিভূষণের সেই মানবিক দৃষ্টি।
দীর্ঘ নির্জনে আজও অনুভব করি তোমার স্তব্ধতা।
‘ইছামতী’র তীরে আজও যেন খুঁজে ফিরি তোমায়।
শালবনের পাতায়, কাশবনের দোলায়, বর্ষার জলে, শরতের আকাশে—
বাংলার প্রকৃতির প্রতিটি অনুচ্চারিত সৌন্দর্যে আজও তোমার পদচিহ্ন খুঁজে পাই।
তুমি ছাড়া শূন্য যে ‘বিপিনের সংসার’,
রোজ সন্ধ্যায় যেন আগের মতো আলো জ্বলে না ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এ।
অপুর সেই পথ যেন আজও শেষ হয়নি—
সে পথ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে চলেছে তোমার পাঠক।
তোমার সাহিত্য শুধু গল্প বলে না—
মানুষকে দেখতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়।
তোমার কলমে দরিদ্র মানুষ হয়ে ওঠে মহিমান্বিত,
নির্জন অরণ্য হয়ে ওঠে জীবন্ত,
একটি ছোট্ট গ্রাম হয়ে ওঠে সমগ্র পৃথিবী,
আর একটি শিশুর চোখে ধরা পড়ে অনন্ত মহাবিশ্ব।
১ নভেম্বর ১৯৫০, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ভারতের ঘাটশিলায় থেমে যায় তোমার নশ্বর জীবনের পথচলা। কিন্তু সাহিত্যস্রষ্টার কি সত্যিই ‘জন্ম ও মৃত্যু’ হয়?
না—
সৃষ্টিশীল মানুষের শরীরের মৃত্যু হয়,
কিন্তু তাঁর সৃষ্টি বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে।
তাই তুমি নেই—এ কথা সত্য নয়।
তুমি আছো ‘পথের পাঁচালী’র পাতায়,
আছো অপুর স্বপ্নে,
আছো ‘চাঁদের পাহাড়’-এর অভিযাত্রায়,
আছো ‘আরণ্যক’-এর অরণ্যে,
আছো ‘ইছামতী’র স্রোতে,
আর আছো বাংলা ভাষার প্রতিটি সংবেদনশীল পাঠকের হৃদয়ে।
তোমার ‘ইছামতী’-র জন্য মৃত্যুর পর ১৯৫১ সালে তুমি লাভ করেছিলে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার।
স্বপ্নহীন অতল ঘুমে নয়—
তুমি আজও জেগে আছো আমাদের পাঠে,
আমাদের স্মৃতিতে,
আমাদের কল্পনায়,
আমাদের ভালোবাসায়।
হে প্রকৃতির কবি,
হে মানুষের কথাশিল্পী,
হে ‘অপরাজিত’-এর অমর স্রষ্টা—
তোমার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
বিভূতিভূষণ, তুমি নেই—
কিন্তু তোমার সাহিত্য আছে।
আর যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে,
ততদিন বাঙালির হৃদয়ে
তুমিও বেঁচে থাকবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।


