খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৩ পিএম
“আমি মানুষের মুক্তির কথা বলি,
আমি মানুষের স্বাধীনতার কথা বলি
আমি সেই মুক্তি চাই, যেখানে মানুষ
নিজের মতো করে বাঁচতে পারে।”
বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেননি তিনি। বরং যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তচিন্তা ও নির্ভীক উচ্চারণকে সঙ্গী করে নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র পথ। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক ও শিক্ষক—এক কথায় বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য বহুমাত্রিক প্রতিভা।
তিনি হুমায়ুন আজাদ।
১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের রাড়িখালে তাঁর জন্ম। পিতা আবদুর রাশেদ ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা জোবেদা খাতুন গৃহিণী। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল হুমায়ুন কবির। ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হুমায়ুন আজাদ’ নাম গ্রহণ করেন।
রাড়িখাল স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৭৬ সালে।
১৯৭০ সালে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর একই বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে নিরলসভাবে লিখে গেছেন।
তাঁর কলম ছিল একাধারে যুক্তির, প্রতিবাদের এবং মুক্তচিন্তার কলম।
ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, কুসংস্কার, পুরুষতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাচারের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ ছিল স্পষ্ট ও নির্ভীক। তাঁর এই অকপট অবস্থান তাঁকে যেমন অসংখ্য পাঠকের প্রিয় করে তুলেছিল, তেমনি তাঁকে করে তুলেছিল প্রবল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘নারী’, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’, অসংখ্য কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা ও ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ। বিশেষ করে ‘নারী’ ও ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ বাংলা সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্ক, নারীর অধিকার ও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
কিন্তু মুক্তচিন্তার এই মানুষটির জীবন একসময় ভয়াবহ আক্রমণের মুখে পড়ে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর বাংলা একাডেমি ও টিএসসির মধ্যবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন হুমায়ুন আজাদ। তাঁকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই হামলা তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়।
নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পরবর্তীতে জার্মানির পি.ই.এন. কর্তৃপক্ষের ফেলোশিপ নিয়ে তিনি জার্মানিতে যান। সেখানে তিনি জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনে-এর জীবন ও কবিতা নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—
মিউনিখে ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়।
মাত্র ৫৭ বছরের জীবনে যে মানুষটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এত প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, এত প্রচলিত বিশ্বাসকে নাড়া দিয়েছিলেন, এত অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুক্তির আলো জ্বালিয়েছিলেন—হঠাৎ করেই থেমে গেল তাঁর প্রাণের স্পন্দন।
তাঁর মৃত্যু ছিল শুধু একজন লেখকের মৃত্যু নয়;
এ যেন ছিল একটি তীক্ষ্ণ, প্রশ্নমুখর, নির্ভীক কণ্ঠের আকস্মিক নীরব হয়ে যাওয়া।
হুমায়ুন আজাদ বিশ্বাস করতেন—প্রশ্ন করতে হয়, কারণ প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় জ্ঞান; প্রচলিত বিশ্বাসকে যাচাই করতে হয়, কারণ অন্ধ আনুগত্য মানুষকে মুক্ত করে না।
তাই মৃত্যুর পরও তিনি আমাদের সামনে ফিরে আসেন তাঁর বইয়ের পাতায়, তাঁর যুক্তিতে, তাঁর প্রশ্নে, তাঁর প্রতিবাদে।
একজন লেখক মারা যান,
কিন্তু তাঁর চিন্তা মারা যায় না।
আজও যখন সমাজে কুসংস্কার মাথা তোলে, যখন মৌলবাদ মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করতে চায়, যখন যুক্তির বদলে অন্ধবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে—তখন হুমায়ুন আজাদের লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুক্তবুদ্ধির লড়াই কখনো শেষ হয় না।
তিনি ছিলেন প্রচলিতের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানোর সাহসী মানুষ।
তিনি ছিলেন প্রশ্ন করতে শেখানো এক শিক্ষক।
তিনি ছিলেন অন্ধকারের ভেতর যুক্তির প্রদীপ জ্বালানো এক লেখক।
হুমায়ুন আজাদ তাই কেবল একটি নাম নন
তিনি বাংলা ভাষার মুক্তচিন্তার ইতিহাসে এক অনিবার্য অধ্যায়।
আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই প্রথাবিরোধী, নির্ভীক ও বহুমাত্রিক মননশীল মানুষটিকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ — ১২ আগস্ট ২০০৪)
“মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাও,
তবেই সে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে।”
মন্তব্য