খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
সুহাসিনী দাস—একটি নাম, একটি সাহসী সময়ের প্রতিচ্ছবি; যাঁর জীবনজুড়ে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং দেশ ও সমাজের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে পূর্ব বাংলার এই নির্ভীক নারী সংগঠক বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি ছিলেন একজন সাহসী সংগঠক ও মানবসেবী।
১৯১৫ সালের ১৬ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে জন্মগ্রহণ করেন সুহাসিনী দাস। পিতা প্যারীমোহন রায়, মাতা শোভা রায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিলেটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কুমুদ চন্দ্র দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; বিয়ের মাত্র চার বছরের মাথায় স্বামীর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন মানুষের কল্যাণে।
প্রথমে সমাজসেবা, পরে রাজনীতি—এই পথেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া বিপুল সম্পত্তির সামান্য অংশ নিজের প্রয়োজনের জন্য রেখে প্রায় সবটাই তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেন। সম্পদের প্রতি মোহ নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র।
১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি কংগ্রেসের প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তাঁকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার নারী সমাজের এক সাহসী মুখে পরিণত করে।
১৯৪৭ সালে কুলাউড়ার রঙ্গিরকুল পাহাড়ে কংগ্রেস কর্মীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি আশ্রম। সুহাসিনী দাস ছিলেন সেই আশ্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোতে তাঁর সাহস, বিচক্ষণতা ও মানবিকতা এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল, মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখনও সুহাসিনী দাস রঙ্গিরকুল আশ্রম ছেড়ে যাননি। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সেবা ও আশ্রয়ের হাত বাড়িয়ে দেন। হানাদার বাহিনী একাধিকবার আশ্রমে হামলা চালালেও তাঁর দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞায় আশ্রমটি রক্ষা পায়। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—মানবতার কাছে এ ছিল তাঁর এক অনন্য অঙ্গীকার।
স্বাধীনতার পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে তিনি নিজেকে পুরোপুরি সমাজসেবায় নিয়োজিত করেন। বিশেষ করে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা, তাদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানুষের জন্য তাঁর আজীবন আত্মনিবেদন তাঁকে পরিণত করে এক অনুকরণীয় সমাজকর্মীতে।
১৯৭৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবর্ধিত করে। সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় ‘সমাজসেবা’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
অগ্নিযুগের এই সাহসী নারী, মানবতার নির্ভীক সেবক সুহাসিনী দাস ২০০৯ সালের ২৪ মে পরলোকগমন করেন।
সময়ের স্রোতে মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু জীবন ইতিহাসের পাতায় থেকে যায় মানুষের সাহস, ত্যাগ আর ভালোবাসার অনন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে। সুহাসিনী দাস তেমনই এক মহীয়সী নারী—যাঁর জীবন আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হলো সাহস, আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো মানবতা।
অগ্নিযুগের বিপ্লবী, সংগ্রামী নারী ও মানবতার অকুতোভয় সৈনিক সুহাসিনী দাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য