ভারতীয় চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে যাঁদের হাত ধরে সুরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল, রাইচাঁদ বড়াল তাঁদের অন্যতম।* তিনি শুধু একজন প্রতিভাবান সুরকারই ছিলেন না, চলচ্চিত্রের সংগীতকে আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন একজন অগ্রপথিক। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নেপথ্য সংগীত, প্লেব্যাক বা নেপথ্য কণ্ঠে গান ধারণের পদ্ধতির বিকাশে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। এ কারণেই সংগীতবোদ্ধাদের কাছে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে সম্মানিত।
*জন্ম ১৯ অক্টোবর ১৯০৩, কলকাতায়।* পিতা লালচাঁদ বড়াল ছিলেন একজন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ। সংগীতময় পারিবারিক পরিবেশেই রাইচাঁদ বড়ালের বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি তবলা ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সংগীতজ্ঞান সমৃদ্ধ করেন। রামপুর ও গোয়ালিয়রের সংগীত-ঐতিহ্যের প্রভাবও তাঁর সংগীতজীবনকে সমৃদ্ধ করেছিল।
১৯২৭ সালে কলকাতায় ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় ভারতীয় বেতার সম্প্রচার ছিল বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে। বেতারে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সংগীত পরিবেশন, শ্রোতার রুচি এবং শব্দের উপস্থাপন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
১৯৩০-এর দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নির্বাক যুগের অবসান ঘটিয়ে সবাক চলচ্চিত্রের সূচনা হয়। চলচ্চিত্রে সংলাপের পাশাপাশি গানও দ্রুত জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনশীল সময়ে রাইচাঁদ বড়াল যুক্ত হন কলকাতার বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান *নিউ থিয়েটার্সের* সঙ্গে। এখান থেকেই শুরু হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে তাঁর সৃজনশীল অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৩১ সালে নির্মিত বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘দেনা পাওনা’র সংগীত পরিচালনার সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে যুক্ত। চলচ্চিত্রের গানকে গল্প, চরিত্র ও আবেগের সঙ্গে সমন্বিত করার ক্ষেত্রে তিনি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন।
রাইচাঁদ বড়ালের নাম উচ্চারিত হলেই ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সংগীতের বিকাশের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। সে সময় চলচ্চিত্রে গান ধারণ করা ছিল অত্যন্ত জটিল কাজ। অভিনয়ের দৃশ্য ধারণের সময় শিল্পীদের সরাসরি গান গাইতে হতো। এতে অভিনয়, কণ্ঠস্বর, বাদ্যযন্ত্র ও শব্দ ধারণের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ত।
চলচ্চিত্র পরিচালক নীতিন বসু এবং শব্দ প্রকৌশলী মুকুল বসুর সঙ্গে রাইচাঁদ বড়াল এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩৫ সালের ‘ধূপছাঁও’ হিন্দি চলচ্চিত্রে পূর্বে ধারণ করা কণ্ঠের সঙ্গে পর্দার অভিনয় মিলিয়ে গান উপস্থাপনের পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত।
এই পদ্ধতির ফলে গায়ক ও অভিনেতা একই ব্যক্তি হওয়া বাধ্যতামূলক থাকল না। দক্ষ গায়কের কণ্ঠে গান ধারণ করে পর্দার অভিনেতার ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো। পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
আজকের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সংগীত একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য ব্যবস্থা। কিন্তু এই ব্যবস্থার বিকাশের পেছনে যাঁরা প্রাথমিক পর্যায়ে নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, রাইচাঁদ বড়াল তাঁদের অন্যতম।
রাইচাঁদ বড়ালের সংগীতজীবনের আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় কিংবদন্তি গায়ক-অভিনেতা কুন্দনলাল সায়গলের সঙ্গে তাঁর কাজ। সায়গলের অসাধারণ কণ্ঠপ্রতিভাকে চলচ্চিত্রের জগতে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিউ থিয়েটার্সের সংগীতপরিমণ্ডলে সায়গলের গায়কির বিকাশ এবং জনপ্রিয়তার সঙ্গে বড়ালের সুরারোপের গভীর সম্পর্ক ছিল।
কানন দেবীর মতো প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁদের সহযোগিতায় বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের বহু গান জনপ্রিয়তা লাভ করে। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে সুরের মাধ্যমে আবেগকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।
রাইচাঁদ বড়ালের সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তির সঙ্গে চলচ্চিত্রের উপযোগী সুরের সমন্বয়। গজল, ঠুমরি, কীর্তনসহ ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারার অনুষঙ্গ তিনি চলচ্চিত্রের গানে ব্যবহার করেছেন। একই সঙ্গে সেতার, বেহালা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রেশনের প্রয়োগকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি শুধু গানের সুর নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; চলচ্চিত্রের দৃশ্য, আবহ ও নাটকীয়তার সঙ্গে সংগীতকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার প্রতিও গুরুত্ব দিতেন। আবহসংগীতের পৃথক ব্যবহার এবং দৃশ্যের আবেগকে সংগীতের মাধ্যমে গভীরতর করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর সুরে একদিকে শাস্ত্রীয় সংগীতের গাম্ভীর্য, অন্যদিকে সাধারণ শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো সহজ আবেদন মিলেমিশে থাকত। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে সমকালীন অনেক সুরকারের তুলনায় স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়।
রাইচাঁদ বড়ালের সংগীত পরিচালনায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
– ‘চণ্ডীদাস’ (১৯৩২ ও ১৯৩৪ সালের সংস্করণ)
– ‘দেবদাস’ (১৯৩৫)
– ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৭)
– ‘প্রেসিডেন্ট’ (১৯৩৭)
– ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’ (১৯৩৮)
– ‘সাপেরা’ (১৯৩৯)
– ‘লগন’ (১৯৪১)
– ‘সৌগন্ধ’ (১৯৪২)
– ‘উদয়ের পথে’ (১৯৪৪)
– ‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু’ (১৯৫৩)
তাঁর সুরারোপিত স্মরণীয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘চণ্ডীদাস’ চলচ্চিত্রের *‘প্রেম নগর মে বনায়ুঙ্গি ঘর ম্যায়’, ‘দেবদাস’-এর *‘বালম আয়ে বসো মোরে মন মে’* এবং ‘প্রেসিডেন্ট’-এর *‘এক বাংলা বনে ন্যারা’**। এসব গানে সুর, কণ্ঠ ও আবেগের যে সমন্বয় দেখা যায়, তা তৎকালীন চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই গানগুলোর মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতপ্রতিভা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি স্পষ্ট হয়েছে চলচ্চিত্রের গল্প ও চরিত্রের সঙ্গে গানকে একাত্ম করে তোলার ক্ষমতা।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাইচাঁদ বড়াল ১৯৭৮ সালের *দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার* লাভ করেন। এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে পরিচিত। একই বছর তিনি সংগীত-নাটক আকাদেমি পুরস্কারেও সম্মানিত হন।
এই স্বীকৃতিগুলো কেবল একজন সুরকারের ব্যক্তিগত সাফল্যের নিদর্শন নয়; ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা ও অবদানেরও মূল্যায়ন।
তাঁর কাজের গুরুত্ব বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, তিনি এমন এক সময়ে চলচ্চিত্রের সংগীত নিয়ে কাজ করেছেন, যখন প্রযুক্তি, রেকর্ডিং ব্যবস্থা ও সংগীত পরিচালনার পদ্ধতি আজকের মতো উন্নত ছিল না। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি যে সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের সংগীত পরিচালকদের জন্য পথ তৈরি করেছে।
১৯৮১ সালের ২৫ নভেম্বর কলকাতায় এই মহান সংগীতসাধকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতজগৎ হারায় এক অগ্রদূতকে। কিন্তু সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও অমলিন।
একজন প্রকৃত শিল্পীর সার্থকতা শুধু তাঁর জীবদ্দশার জনপ্রিয়তায় নয়; তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম কতটা অনুপ্রাণিত হয়, তার মধ্যেও নিহিত। রাইচাঁদ বড়ালের জীবন ও কর্ম সেই সত্যেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি চলচ্চিত্রের গানকে কেবল বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি; সুর, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র ও দৃশ্যের সমন্বয়ে এক স্বতন্ত্র শিল্পরূপ নির্মাণে অবদান রেখেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীত যে আজ এত বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ, তার প্রাথমিক ভিত নির্মাণে তাঁর মতো পথিকৃৎদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন।
আজ তাঁর জন্মদিনে সংগীতের এই মহান কারিগরের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর সুরসাধনা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সংগীতের প্রতি নিবেদন ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
*শ্রদ্ধাঞ্জলি, রাইচাঁদ বড়াল।*
যে সুর একদিন চলচ্চিত্রের পর্দায় মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিল, সেই সুরের ইতিহাসে তাঁর নাম বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।


