স্মরণ – একাত্তরের বন্ধু, বীরাঙ্গনাদের আপনজন – ড. নীলিমা ইব্রাহিম

কিছু মানুষ ইতিহাসের পাতায় শুধু নিজের নামটুকু লিখে যান না, তাঁরা রেখে যান সাহস, মানবিকতা, বিবেক ও দায়বদ্ধতার এক অনন্য উত্তরাধিকার। তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, বিপন্ন মানুষের আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা। ড. নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন তেমনই একজন মহীয়সী নারী—একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, মননশীল সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক এবং একাত্তরের নির্যাতিত নারীদের বেদনার বিশ্বস্ত কথক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, বিশেষত বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ, নিপীড়ন ও পুনর্বাসনের সংগ্রামে, তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ড. নীলিমা ইব্রাহিম শুধু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়াননি; তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সেইসব মানুষের পাশে, যাঁদের যন্ত্রণার কথা সমাজ অনেক সময় শুনতে চায়নি, যাঁদের ক্ষতকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছে প্রচলিত সংস্কার ও সামাজিক সংকীর্ণতা। তিনি তাঁদের দুঃখ শুনেছেন, তাঁদের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যের পাতায় তুলে ধরে জাতির বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। এ কারণেই তিনি কেবল একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বা সাহিত্যিক নন—তিনি একাত্তরের মানবিক ইতিহাসের এক সাহসী সাক্ষী।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের জন্ম ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামে। তাঁর পিতা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী এবং মাতা কুসুম কুমারী দেবী। শৈশব থেকেই মেধা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

১৯৩৫ সালে খুলনার করোনেশন গার্লস স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। এরপর কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও অর্থনীতিতে অনার্স সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিটি ডিগ্রি লাভ করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল বহুমাত্রিক। অর্থনীতি, বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষাবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান তাঁর চিন্তাজগৎকে সমৃদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে এই বিস্তৃত জ্ঞান ও মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

নীলিমা রায় চৌধুরী থেকে নীলিমা ইব্রাহিম

১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন চিকিৎসক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর নীলিমা রায় চৌধুরী পরিচিত হন নীলিমা ইব্রাহিম নামে। স্বামীর বদলিজনিত কর্মজীবনের কারণে তাঁকে পিরোজপুর, যশোর, বরিশাল ও খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে হয়।

জীবনের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও তাঁর জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা থেমে থাকেনি। ১৯৫৬ সালে তিনি উচ্চতর গবেষণার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন এবং একই বছরের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। অধ্যবসায়, মেধা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর কর্মজীবনের প্রধান ক্ষেত্র। বাংলা বিভাগের প্রধান, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট এবং সংস্কৃত ও পালি বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের মননশীলতা, মুক্তবুদ্ধি, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও ভূমিকা রেখেছেন।

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম—দেশের প্রতিটি সংকটময় সময়ে ড. নীলিমা ইব্রাহিমের অবস্থান ছিল মানুষের মুক্তি, অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও নারকীয় তাণ্ডবের ভয়াবহতা তিনি প্রত্যক্ষ করেন।

২৭ মার্চ তিনি ক্যাম্পাস ছেড়ে নারিন্দায় আশ্রয় নেন এবং ৩০ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। পরে আগস্টে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ, প্রচারপত্র বিলি এবং ছাত্রছাত্রীদের মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করার কাজে সক্রিয় ছিলেন।

তাঁর এসব কর্মকাণ্ড পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের বিরাগভাজন করে তোলে। তৎকালীন সামরিক শাসক টিক্কা খানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে সতর্কপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই চিঠি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন বিবরণে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও তিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের বিচার করেননি; বরং দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের মধ্যেও তিনি মুক্তিকামী মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁর এই ভূমিকা প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনের লড়াই ছিল না—এটি ছিল বিবেকবান মানুষেরও সংগ্রাম।

বীরাঙ্গনাদের পাশে এক সাহসী মানবিক মুখ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে অসংখ্য নারী নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। স্বাধীনতার পর তাঁদের অনেককে সমাজের অবহেলা, কুসংস্কার, অপমান ও নিঃসঙ্গতার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তখনো শেষ হয়নি।

এই বাস্তবতা ড. নীলিমা ইব্রাহিমকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত নারী পুনর্বাসন বোর্ডের কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বোর্ডের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পুনর্বাসনকেন্দ্রে গিয়ে তিনি বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের যন্ত্রণার কথা শুনেছেন এবং বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছেন।

তাঁর কাছে এই নারীরা করুণার পাত্র ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একাত্তরের নির্যাতনের শিকার, স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারসম্পন্ন মানুষ। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো মানে ছিল সমাজের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নীরবতার দেয়াল ভেঙে সত্যকে সামনে নিয়ে আসা।

ব্যক্তিগত উদ্যোগেও তিনি বহু নির্যাতিত নারীকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ ছিল সাহসী, সংবেদনশীল ও সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর এক পদক্ষেপ।

‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’: ইতিহাসের কাছে এক অমোঘ জবানবন্দি

বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ড. নীলিমা ইব্রাহিম জানতে পারেন তাঁদের ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ, তাঁদের হারানোর বেদনা, অসহায়ত্ব এবং বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ের কথা। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে তাড়িত করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই নারীদের যন্ত্রণা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা আড়াল করা মানে ইতিহাসের সত্যকে অসম্পূর্ণ রাখা।

এই উপলব্ধিরই শিল্পিত ও প্রতিবাদী প্রকাশ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। গ্রন্থটিতে তিনি কয়েকজন বীরাঙ্গনার অভিজ্ঞতা ও নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তাঁদের কণ্ঠস্বরকে পৌঁছে দিয়েছেন বৃহত্তর সমাজের কাছে। তাঁদের ব্যক্তিগত বেদনার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে যুদ্ধের বর্বরতা, নারীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজের নির্মম বাস্তবতা।

‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি একাত্তরের নির্যাতিত নারীদের পক্ষে দাঁড়ানো এক মানবিক দলিল, নীরব ইতিহাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিবাদ এবং জাতির বিবেকের কাছে এক অনিবার্য প্রশ্ন। এই গ্রন্থ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু বিজয়ের গৌরবগাথা নয়; এর ভেতরে রয়েছে অগণিত মানুষের অশ্রু, আত্মত্যাগ, ক্ষত ও অসমাপ্ত লড়াই।

নীলিমা ইব্রাহিম তাঁদের যন্ত্রণাকে সাহিত্যিক সংবেদনশীলতায় ধারণ করেছেন, কিন্তু সেই বেদনার গভীরতা আড়াল করেননি। বরং পাঠককে মুখোমুখি করেছেন এমন এক সত্যের, যা ভুলে যাওয়া যায় না, উপেক্ষা করা যায় না। তাঁর এই কাজ তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য মানবিক সাক্ষীতে পরিণত করেছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি সংরক্ষণে অবদান

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে দেশের বহু শ্রেষ্ঠ সন্তান—শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী—নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। স্বাধীনতার পর তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং জাতির কাছে তাঁদের আত্মত্যাগকে চিরজাগরূক রাখার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম।

মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। শহীদদের স্মৃতিকে সম্মান জানানো, তাঁদের আত্মত্যাগকে জাতীয় চেতনার অংশ করে তোলা এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কেবল অতীতের বেদনাকে স্মরণ করেননি; বরং সেই বেদনা থেকে দায়িত্ববোধ গ্রহণ করে দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

শিক্ষকতা, সমাজসেবা ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার, সামাজিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিকাশে সক্রিয় ছিলেন।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া Associated Country Women of the World-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের এরিয়া প্রেসিডেন্ট এবং International Alliance of Women-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী কংগ্রেসে যোগদান করেন তিনি। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করা ছিল তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

১৯৭৪–৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কোনো বেতন বা সম্মানী গ্রহণ করেননি। জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার মানসিকতা এই ঘটনা থেকে প্রতিফলিত হয়।

সাহিত্যকীর্তি ও মননের বিস্তার

ড. নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন গবেষক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সাহিত্যসমালোচক। বাংলা সাহিত্য, নাটক, বাঙালির মনন ও সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি বাংলা সাহিত্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—

– শরৎ প্রতিভা
– বাংলার কবি মধুসূদন
– বাংলা নাটক: উৎস ও ধারা
– বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য
– আমি বীরাঙ্গনা বলছি

তাঁর সাহিত্যকর্মে ইতিহাসবোধ, সমাজসচেতনতা, মানবিক সংবেদনশীলতা ও যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে শুধু সৌন্দর্য অন্বেষণ করেননি; মানুষের জীবন, সমাজের বৈষম্য, ইতিহাসের ক্ষত এবং ন্যায়বোধের প্রশ্নও তুলে ধরেছেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে তাঁর প্রকৃত অর্জন কেবল পুরস্কার বা পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং ইতিহাসের অবহেলিত কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসার সাহস।

প্রস্থান, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু নেই

২০০২ সালের ১৮ জুন ড. নীলিমা ইব্রাহিম পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর শারীরিক প্রস্থান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর কর্ম, সাহিত্য ও মানবিক আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক।

যখন আমরা ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ পড়ি, তখন কেবল কয়েকজন নির্যাতিত নারীর জীবনের কথা জানতে পারি না; আমরা অনুভব করি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গভীর মানবিক মূল্য, নারীর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এবং একটি সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। যখন তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—দেশপ্রেম মানে শুধু দেশের গৌরবগাথা উচ্চারণ নয়; দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং অবহেলিত মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করা।

ড. নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন একাত্তরের বন্ধু, বীরাঙ্গনাদের আপনজন এবং সত্য উচ্চারণে নির্ভীক এক মানবিক কণ্ঠস্বর। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ইতিহাসের ক্ষতকে ঢেকে রাখলে জাতি সুস্থ হয় না; সত্যকে স্বীকার করতে হয়, নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে হয় এবং মানুষের মর্যাদাকে সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হয়।

আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই মহীয়সী নারীকে। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের বিবেককে জাগ্রত করুক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও দৃঢ় করুক এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষায় আমাদের অনুপ্রাণিত করুক।

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মানবিকতার ইতিহাসে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং বীরাঙ্গনাদের আত্মমর্যাদার সংগ্রামে আপনি চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।