স্মরণ – একাত্তরের বীরাঙ্গনা, লেখিকা রমা চৌধুরী

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রমা চৌধুরী এক বেদনাবিধুর অথচ অসীম সাহসের নাম। তিনি কেবল একজন নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নন, তিনি একাত্তরের নির্মমতার জীবন্ত সাক্ষী, সন্তানহারা এক শোকাতুর জননী এবং অদম্য আত্মমর্যাদার অধিকারী এক সংগ্রামী লেখক। তাঁর জীবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা, ব্যক্তিগত শোক, নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য আর আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার এক অসাধারণ ইতিহাস।

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। শৈশব থেকেই মেধাবী এই নারী উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু তাঁর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যায় ১৯৭১ সালে। বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করে দিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন হত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছিল, তখন রমা চৌধুরীও তাদের পাশবিকতার শিকার হন।

মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা ও এক নারীর অসীম সাহস

১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরে নিজ বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন রমা চৌধুরী। সম্ভ্রম হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে তাঁকে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করতে হয়। এরপর গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁর ঘরবাড়ি ও যাবতীয় সহায়-সম্পদ। মুহূর্তেই হারিয়ে যায় তাঁর নিরাপদ আশ্রয়, সংসারের অবলম্বন আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা।

তখন তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী। সঙ্গে ছিলেন বৃদ্ধা মা। ঘরবাড়িহীন অবস্থায় বাকি আটটি মাস তিনটি শিশুসন্তান ও মাকে নিয়ে তাঁকে জলে-জঙ্গলে আশ্রয় খুঁজে বেড়াতে হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের আতঙ্ক, অন্যদিকে সন্তানদের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি দিন ছিল এক দুঃসহ সংগ্রাম।

তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনকে বিস্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে না রেখে পরবর্তী সময়ে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বিশেষত নারীর ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের এক মর্মস্পর্শী দলিল।

বিজয়ের পরও যে শোকের অবসান হয়নি

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হলো। কিন্তু রমা চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনে সেই বিজয় বয়ে আনতে পারেনি স্বস্তি কিংবা আনন্দের পূর্ণতা। যুদ্ধের ক্ষত তখনো তাঁর জীবনে দগদগে; সামনে অপেক্ষা করছিল আরও গভীর বেদনা।

বিজয়ের আগের রাত, ১৫ ডিসেম্বর থেকেই তাঁর সন্তান সাগরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর রাতে মারা যায় ছোট্ট সাগর। ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থের ২১১ পৃষ্ঠায় সন্তান হারানোর সেই অসহনীয় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন—

“ঘরে আলো জ্বলছিল হারিকেনের। সেই আলোয় সাগরকে দেখে ছটফট করে উঠি। দেখি তার নড়াচড়া নেই, সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে, নড়চড় নেই।”

এরপর তাঁর মায়ের বুকফাটা বিলাপ—“আঁর ভাই নাই, আঁর ভাই গেইয়্যে গোই”—অর্থাৎ, আমার ভাই নেই, আমার ভাই চলে গেছে। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেন ধরা আছে একটি পরিবারের ভেঙে পড়া পৃথিবী, একজন মায়ের হাহাকার আর যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের অশ্রুসিক্ত বাস্তবতা।

সাগরের মৃত্যুর পর একই অসুখে আক্রান্ত হয় তাঁর আরেক সন্তান। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানসিক বিপর্যস্ততার এক কঠিন সময়ে ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তার শ্বাসরোধ হয়ে যায়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে টগরও। একের পর এক দুই সন্তানকে হারানোর শোক তাঁর জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

প্রথম সংসারের পরিসমাপ্তির পর দ্বিতীয় সংসার গড়তে গিয়েও প্রতারণার শিকার হন তিনি। দ্বিতীয় সংসারের সন্তান টুনুও ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

তিন সন্তানকে হারানোর এই বেদনা কোনো ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যে মা সন্তানদের বুকে আগলে রেখে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই মাকেই জীবনের নির্মম পরিহাসে একে একে তিন সন্তানের বিদায় দেখতে হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এই ট্র্যাজেডি তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য, বেদনাময় চরিত্রে পরিণত করেছে।

লেখালেখিই হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন

স্বাধীনতার পর জীবনের প্রায় দুই দশক লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। শুরুতে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। লেখার বিনিময়ে অর্থের পরিবর্তে পেতেন পত্রিকার ৫০টি কপি। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা।

পরবর্তী সময়ে নিজের লেখা বই নিজেই প্রকাশ করে ফেরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন। পথে পথে ঘুরে নিজের বই বিক্রি করে জীবনধারণের এই কঠিন পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন কারও কাছে আত্মসমর্পণ না করে, নিজের আত্মমর্যাদা অটুট রাখার প্রত্যয়ে।

প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতাসহ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মের কেন্দ্রজুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষত, সমাজবাস্তবতা এবং মানুষের প্রতি গভীর অনুভব।

‘একাত্তরের জননী’ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাময় স্মৃতিচারণ নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীর ওপর সংঘটিত নির্যাতন, যুদ্ধের নির্মমতা এবং স্বাধীনতার পরও বয়ে বেড়ানো ক্ষতগুলোর এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক বিবরণের বাইরে যে মানুষের কান্না, নিঃসঙ্গতা ও আত্মত্যাগ রয়ে যায়, তাঁর লেখায় সেই অনুচ্চারিত ইতিহাসও কণ্ঠ পেয়েছে।

জীবনযাপনে প্রতিবাদ, শোকে নীরব প্রতিজ্ঞা

রমা চৌধুরীর জীবনযাপনের কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে মৃতদেহ দাহ করার প্রচলিত প্রথার পরিবর্তে তিনি নিজের সন্তানদের মাটিতে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেন। মুক্তিযুদ্ধের পর টানা চার বছর তিনি জুতা পরেননি। পরে নিকটজনদের অনুরোধে অনিয়মিতভাবে জুতা পরলেও তৃতীয় সন্তান টুনুর মৃত্যুর পর আবার তা পরিত্যাগ করেন। জীবনের শেষ ১৫ বছর তিনি জুতা ছাড়াই চলাফেরা করেছেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর এই জীবনাচরণ ছিল ব্যক্তিগত শোক, বিশ্বাস ও নিজস্ব সিদ্ধান্তের এক অনন্য প্রকাশ। তাঁর জীবনকে বুঝতে গেলে এসব আচরণের পেছনে থাকা গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকেও উপলব্ধি করতে হয়।

তিনি কারও করুণা নিয়ে বাঁচতে চাননি। বরং নিজের লেখা বই হাতে নিয়ে পথে পথে ঘুরেছেন, মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সাক্ষ্য। দারিদ্র্য তাঁকে ঘিরে ধরেছিল, কিন্তু আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।

একাত্তরের জননী: একটি জীবনের চেয়েও বড় ইতিহাস

রমা চৌধুরীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি অসংখ্য মা, বোন ও নারীর ত্যাগ, নির্যাতন, অশ্রু এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের ইতিহাসও। স্বাধীনতার লাল সূর্য ওঠার পরও অনেকের জীবনে অন্ধকার দীর্ঘ হয়েছে, অনেক ক্ষত কখনো শুকায়নি।

তাঁর জীবন ছিল একদিকে নির্মম নির্যাতনের শিকার একজন নারীর ইতিহাস, অন্যদিকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহসী মানুষের কাহিনি। তিনি নিজের দুঃখকে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির ভেতরে আটকে রাখেননি; কলমের মাধ্যমে তাকে জাতির ইতিহাসের অংশ করে তুলেছেন। সেই কারণেই রমা চৌধুরী শুধু একজন লেখিকা নন—তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বীরাঙ্গনাদের অব্যক্ত বেদনা এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক।

২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রমা চৌধুরী। তাঁর প্রয়াণে থেমে যায় এক দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পথচলা; কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর লেখা, তাঁর সাক্ষ্য কিংবা তাঁর জীবনের গভীর তাৎপর্য।

আজ তাঁর জন্মদিনে এই মহীয়সী নারীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।

যে নারী একাত্তরের অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন, একে একে হারিয়েছেন তিন সন্তানকে, দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের কলমকে বেঁচে থাকার হাতিয়ার করেছেন—তাঁর জীবন আমাদের শোকাহত করে, একই সঙ্গে সাহস জোগায়।

রমা চৌধুরী আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন ‘একাত্তরের জননী’ হয়ে—একজন নির্যাতিত বীরাঙ্গনা, সন্তানহারা মমতাময়ী মা এবং সত্য উচ্চারণে অবিচল এক সংগ্রামী লেখিকা হিসেবে।

তাঁর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।