সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির শিকার হয়ে ওহিদুজ্জামান শামীম (নাম অনুযায়ী পরিচিত) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে স্থানীয় কয়েকজনের মারধরের শিকার হওয়ার পর তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবারও হামলার শিকার হন তিনি।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার ছোট শান্তা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা শামসুর রহমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে দুপুরে উপজেলার সখীপুর এলাকায় শামীমকে মারধর করেন কয়েকজন ব্যক্তি। একপর্যায়ে তিনি নিজ বাড়িতে গিয়ে বিষপান করেন।
পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে একদল বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাসপাতালে প্রবেশ করেন। তাঁরা চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর আবারও হামলা চালান। দ্বিতীয় দফার মারধরের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার দায় নির্ধারণ—দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো বক্তব্য বা অডিওকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের তদন্ত ও অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। পরে হাসপাতালে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসাধীন একজন রোগীর ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, কীভাবে তাঁরা সেখানে প্রবেশ করলেন এবং হামলা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ থাকলেও কাউকে মারধর করে শাস্তি দেওয়া আইনসম্মত নয়। বিশেষ করে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন ব্যক্তির ওপর পুনরায় হামলার ঘটনা হাসপাতালের নিরাপত্তা ও রোগীর সুরক্ষা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এ ঘটনায় পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তের ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে।


