স্মরণ – মুক্তিযুদ্ধের দুঃসময়ের বন্ধু, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে এক স্মরণীয় ভারতীয় ব্যক্তিত্ব

ইতিহাসে কিছু মানুষের পরিচয় কেবল তাঁদের রাজনৈতিক পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার পরিধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের মূল্যায়ন করতে হয় সময়ের কঠিন সন্ধিক্ষণে তাঁদের ভূমিকা, সাহস, সিদ্ধান্ত এবং ইতিহাসের ওপর তাঁদের প্রভাবের নিরিখে। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ছিলেন তেমনই এক আলোচিত ও প্রভাবশালী ভারতীয় রাজনীতিক—যাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিবেশী বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি ভারতের সমর্থন জোরদার করার সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।

জন্ম, পরিবার ও রাজনৈতিক জীবনের সূচনা

সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের জন্ম ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর। তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার হাঁসাড়া গ্রামে। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দৌহিত্র ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন মায়া রায়।

আইনশাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের জন্য পরিচিত সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় পেশাগত জীবনে যেমন প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন, তেমনি রাজনীতিতেও নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

১৯৫৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। অশোক কুমার সেনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতির জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ধীরে ধীরে তিনি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা

১৯৭১ সাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলোর একটি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের মুখে বাঙালি জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ, তখন প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেই সময় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বশীল রাজনীতিক হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের কাজে যুক্ত হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে তাঁকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয় বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব দেশে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা ছিল সেই কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। সেই সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এক বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী: ক্ষমতা, প্রশাসন ও বিতর্ক

১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামল ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অত্যন্ত অস্থির ও সংঘাতময় একটি সময়। নকশাল আন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক তাঁর সরকারের সময়কে ঘিরে রেখেছে।

১৯৭২ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিশেষভাবে বিতর্কিত হয়ে আছে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও রিগিংয়ের অভিযোগ তোলে। বরাহনগরসহ বিভিন্ন আসনে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিপিআই(এম) নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রার্থীদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় বলে রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বিশেষত কাশীপুর-বরাহনগর হত্যাকাণ্ড এবং বামপন্থী কর্মীদের হত্যার ঘটনায় তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। এসব অভিযোগ ও বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও সংবেদনশীল বিষয়।

অন্যদিকে, তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও আইনজ্ঞ হিসেবে খ্যাতিও ছিল সুপরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই একমাত্রিক নয়; সেখানে রয়েছে প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্ক ও কঠিন ঐতিহাসিক প্রশ্নের সহাবস্থান।

ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন

সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সঙ্গে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও আস্থাপূর্ণ। সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে তাঁর মতামত ইন্দিরা গান্ধী গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন। ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটেও সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পরামর্শের কথা রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে।

জরুরি অবস্থার সময় নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করা, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় ভারতের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই অধ্যায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নেও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতির নানা বাঁকে ‘মানুদা’

রাজনৈতিক মহলে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ‘মানুদা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তিনি কখনো শাসক দলের নেতৃত্বে, কখনো দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে, আবার কখনো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সমালোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ওয়াংচু কমিশন গঠনের উদ্যোগ তাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি আলোচিত দিক। আবার কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি একসময় দল ছেড়ে নবকংগ্রেস গঠন করেছিলেন। রাজনৈতিক অবস্থান ও দলীয় সম্পর্কের পরিবর্তন সত্ত্বেও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব দীর্ঘদিন বজায় ছিল।

সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। দুই নেতা রাজনৈতিকভাবে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৌহার্দ্যের কথা বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়। এই বৈপরীত্য ভারতীয় রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

আইনজ্ঞ হিসেবে অসাধারণ খ্যাতি

রাজনীতির বাইরেও সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের অন্যতম বড় পরিচয় ছিল তাঁর আইনজীবীসত্তা। আইনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান, যুক্তি উপস্থাপনের অসাধারণ ক্ষমতা এবং বাগ্মিতার জন্য তিনি বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলেন। ভারতের উচ্চ আদালতগুলোতে আইনজীবী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল বিস্তৃত। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয়ে তাঁর মতামতও মূল্যবান বলে বিবেচিত হতো।

তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি আইন, রাজনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো জটিল বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করতে পারতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণের বিশেষ ক্ষমতা।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অমায়িক ও আলোচনাপ্রিয়। রাজনীতির কঠিন হিসাব-নিকাশের বাইরেও নানা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি ক্রীড়ামোদী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

রাজনীতির ইতিহাসে এক জটিল উত্তরাধিকার

২০১০ সালের ৬ নভেম্বর, ৯০ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভারত হারায় এক প্রভাবশালী রাজনীতিক, অভিজ্ঞ প্রশাসক ও খ্যাতিমান আইনজ্ঞকে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে মূল্যায়ন করতে গেলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করতে হয়, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও নির্বাচনসংক্রান্ত বিতর্কগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে অবদান ও বিতর্ক—দুই দিকই নির্মোহভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে—১৯৭১ সালে মুক্তিকামী বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসে যাঁরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের স্মরণ করা আমাদের কৃতজ্ঞতারই প্রকাশ। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতির ইতিহাস কখনো সাদা-কালো নয়; সেখানে অর্জন ও বিতর্ক পাশাপাশি থাকে। সেই ইতিহাসকে জানতে হয় সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, আর মূল্যায়ন করতে হয় সময়ের প্রেক্ষাপটে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই প্রাজ্ঞ ভারতীয় রাজনীতিককে স্মরণ করছি।

বিনম্র শ্রদ্ধা সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের প্রতি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।