স্মরণ – সহযোদ্ধাদের মধ্যমণি ছিলেন আইভি রহমান

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইতিহাসে আইভি রহমান এক উজ্জ্বল, সাহসী ও সংগ্রামী নারী। তিনি ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এবং রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে তৃণমূলের সহযোদ্ধাদের অত্যন্ত আপনজন। তাঁর পুরো নাম জেবুন্নেছা আইভি রহমান।

১৯৩৬ সালের ৭ জুলাই বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের চণ্ডীবের গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই সমাজ ও রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আইভি রহমান ছিলেন শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন—তিনি ছিলেন একজন সংগঠক, সমাজকর্মী এবং নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং নারীসমাজকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে অসংখ্য নারী রাজনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত হওয়ার সাহস পেয়েছেন।

তাঁর রাজনৈতিক সহযাত্রা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে আইভি রহমানের ছিল নিবিড় পারিবারিক সখ্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আত্মিক।

তাঁর স্বামী ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মো. জিল্লুর রহমান। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক দক্ষতায় আইভি রহমানও হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের একজন নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় নেত্রী। তিনি ছিলেন সহকর্মীদের কাছে স্নেহময়ী, কর্মীদের কাছে আপনজন এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কাছে সাহস ও প্রেরণার প্রতীক।

২১ আগস্ট—রক্তাক্ত ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ দিন

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহূর্তেই সমাবেশস্থল পরিণত হয় রক্তাক্ত প্রান্তরে। লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা।

সেদিনও আইভি রহমান ছিলেন তাঁর প্রিয় সহযোদ্ধাদের মাঝখানে—রাজপথের মানুষের সঙ্গে, সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে। একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে যখন চারদিক মৃত্যুর বিভীষিকায় পরিণত হয়, তখন মানববর্ম তৈরি করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন তাঁর নেতাকর্মীরা। কিন্তু সেই বর্বর হামলায় প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী এবং আহত হন শত শত মানুষ।

আইভি রহমানও গুরুতর আহত হন। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টারের ক্ষত নিয়ে তিনি চলে যান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যু ছিল শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; ছিল একটি রাজনৈতিক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি, ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।

আইভি রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সংগঠনের প্রতি নিষ্ঠা এবং রাজপথে সহযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর সাহস আজও অনুপ্রেরণার উৎস। ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়ে তাঁর নাম লেখা আছে ত্যাগ, সাহস ও আত্মদানের অমোচনীয় অক্ষরে।

আজ ২৪ আগস্ট, তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই মহীয়সী নারীকে।

হে সাহসী সহযোদ্ধা,
তুমি চলে গেছ—কিন্তু তোমার ত্যাগের রক্তিম স্মৃতি
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে চিরদিন জাগরুক থাকবে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আইভি রহমান—তোমার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।