খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী এবং স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান হিসেবে কেভিন পিটারসেনের নাম চিরস্মরণীয়। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও অনেক সময় তাঁর ক্যারিয়ার বেশি আলোচিত হয়েছে মাঠের বাইরের বিতর্কের কারণে। ২০১৪ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন, তখন সেটি ক্রিকেট বিশ্বের জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পিটারসেন দাবি করেছেন, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) খেলার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ এবং অনড় অবস্থানের কারণেই মূলত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) তাঁর ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিয়েছিল।
জনপ্রিয় ইউটিউবার রণবীর আল্লাহবাদিয়ার পডকাস্টে পিটারসেন স্মৃতিকাতর হয়ে জানান, ২০০৯ সালের দিকে যখন আইপিএলের জোয়ার শুরু হয়, তখন ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা খেলোয়াড়দের এই লিগে খেলার অনুমতি দিতে নারাজ ছিল ইসিবি। কিন্তু পিটারসেন আধুনিক ক্রিকেটের এই পরিবর্তনের ঢেউকে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে এই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে।
পিটারসেনের মতে, আইপিএলে খেলার এই দাবি তৎকালীন বোর্ড প্রশাসনের কাছে ছিল অনেকটা অবাধ্যতার শামিল। তিনি বলেন, “আমি আইপিএলকে সমর্থন করায় তৎকালীন প্রশাসনের সবাই আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। আজ ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা অনায়াসে আইপিএল খেলছে, কিন্তু এর জন্য আমাকে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।”
১০৪টি টেস্ট খেলা পিটারসেন মনে করেন, যদি বোর্ডের সঙ্গে তাঁর এই সংঘাত না তৈরি হতো, তবে তাঁর পরিসংখ্যান হতে পারত আরও সমৃদ্ধ। আক্ষেপের সুরে তিনি জানান, তাঁর প্রতিভা এবং ফিটনেস অনুযায়ী অন্তত ১৫০ থেকে ১৬০টি টেস্ট ম্যাচ খেলা তাঁর প্রাপ্য ছিল। বর্তমান সময়ের গ্রেটদের মতো তাঁর ঝুলিতেও থাকতে পারত ১২ থেকে ১৩ হাজার টেস্ট রান। কিন্তু ৩৩ বছর বয়সেই তাঁকে অনেকটা জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়, যা তিনি আজও মেনে নিতে পারেননি।
নিচে কেভিন পিটারসেনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| ফরম্যাট | ম্যাচের সংখ্যা | মোট রান | ব্যাটিং গড় | সেঞ্চুরি | হাফ-সেঞ্চুরি |
| টেস্ট ক্রিকেট | ১০৪ | ৮১৮১ | ৪৭.২৮ | ২৩ | ৩৫ |
| ওয়ানডে (ODI) | ১৩৬ | ৪৪৪০ | ৪০.৭৩ | ৯ | ২৫ |
| টি-টোয়েন্টি (T20I) | ৩৭ | ১১৭৬ | ৩৭.৯৩ | ০ | ৭ |
পিটারসেন নিজেকে আধুনিক ক্রিকেটের ‘শহীদ’ হিসেবে মনে করেন। তাঁর দাবি, তিনি সেই সময়ে বোর্ডের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আইপিএলের পক্ষে লড়েছিলেন বলেই আজ জস বাটলার, বেন স্টোকস বা লিয়াম লিভিংস্টোনদের জন্য পথটা মসৃণ হয়েছে। পিটারসেন জানান, বর্তমান অধিনায়ক জস বাটলারও ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য। আজ ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা আইপিএল থেকে যে বিশাল অঙ্কের অর্থ এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত পিটারসেনের সেই বিদ্রোহই স্থাপন করে দিয়েছিল।
২০০৯ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে আইপিএল যাত্রা শুরু করা এই তারকা ব্যাটসম্যান দিল্লির ডেরডেভিলস (বর্তমান দিল্লি ক্যাপিটালস), রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টসহ মোট পাঁচটি ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। আইপিএলের মঞ্চেও তাঁর ব্যাট কথা বলেছে সমান তেজে।
| আইপিএল ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান | তথ্য |
| মোট ইনিংস | ৩৬ |
| মোট রান | ১০০১ |
| ব্যাটিং গড় | ৩৭.০৭ |
| স্ট্রাইক রেট | ১৩৪.৭২ |
| সর্বোচ্চ স্কোর | ১০৩* |
কেভিন পিটারসেন কেবল একজন ক্রিকেটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর ক্যারিয়ারের অকাল সমাপ্তি হয়তো ইংল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য একটি বড় ক্ষতি ছিল, কিন্তু তাঁর সেই জেদই আজ বিশ্ব ক্রিকেটকে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৫ হাজার রান বা ১৬০টি টেস্টের মাইলফলক ছুঁতে পারেননি, তবে আধুনিক ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধার লড়াইয়ে তিনি সর্বদা বিজয়ী হিসেবেই গণ্য হবেন।