রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা, প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, শিক্ষকদের হুমকি, হামলা এবং রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত মন্তব্য—বিভিন্ন ঘটনায় তার নাম জড়িয়েছে। সর্বশেষ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এতে ক্যাম্পাসের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরও দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আম্মার ও তার অনুসারীদের মধ্যে একধরনের দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও কিছু ঘটনায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে এবং অনেকে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক।
তবে আম্মার এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচির কারণেই তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গ্রন্থাগারে মারধরের ঘটনাকে তিনি আগের একটি হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে ৭৬ লাখ টাকা অনুদান সংগ্রহের অভিযোগ প্রসঙ্গে তার দাবি, ওই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়নি; বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র আড়াই লাখ টাকা।
উপ-উপাচার্যকে ঘিরে সংঘর্ষের অভিযোগ
রাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়ার আগে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়। ওই সময় আম্মার ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনকে জুবেরী ভবনে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। পরে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং উপ-উপাচার্যের ওপর হামলার অভিযোগও সামনে আসে।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে আম্মার দাবি করেছিলেন, শিক্ষকরা তাদের কাছে পিতৃতুল্য এবং তাদের গায়ে হাত তোলা হয়নি। তবে ওই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং ক্যাম্পাসে আন্দোলনের নামে সহিংসতার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগ
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায়ও আম্মারের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মাসুদ এর আগে প্রতিপক্ষের হামলায় এক পা হারিয়েছিলেন এবং কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করতেন। পরে হামলার ঘটনায় আম্মার তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এই ঘটনা নিয়ে আইনগত ও রাজনৈতিক পর্যায়ে নানা আলোচনা হলেও আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
জিএস নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে আম্মারের এখতিয়ারবহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ সামনে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষক সংগঠনও বিবৃতি দিয়ে তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তোলে।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন ডিনের পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে আম্মার সাংবাদিকদের সামনে তাদের ফোন করে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা কতটা এবং কোন সীমার মধ্যে থাকা উচিত—এই ঘটনাগুলো সেই বিতর্কও সামনে নিয়ে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত মন্তব্য
গত মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের এক নারী নেত্রী পাকিস্তানের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলে সেখানে আম্মারের করা একটি মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মন্তব্যটির স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
এর আগে এপ্রিল মাসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের অভিযোগও ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদে খুলনার কয়রা উপজেলায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন এবং তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ঝাড়ু মিছিলের মতো কর্মসূচি পালন করা হয় বলে জানা যায়।
৭৬ লাখ টাকা অনুদান নিয়ে প্রশ্ন
গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই ৩৬ : মুক্তির উৎসব’ নামে একটি কনসার্ট আয়োজনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠানোর অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। পরে এই অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হিসাব প্রকাশের কথা বলেছিলেন।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সেই হিসাব এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। আম্মারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তিনি বলেন, ৭৬ লাখ টাকা সংগ্রহের যে কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে মাত্র আড়াই লাখ টাকা পাওয়া গেছে। ফলে প্রকৃত অর্থে কত টাকা সংগ্রহ ও ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।
সাবেক উপাচার্যকে নিয়ে পুরোনো বিরোধের ইঙ্গিত
মার্চে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের বিদায় উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যেও আম্মার নিজের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করেন। তিনি স্বীকার করেন, উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও চাপ সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। তার এই বক্তব্যকে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
সর্বশেষ হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা
সোমবারের ঘটনাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় একজনকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী আখ্যা দিয়ে আম্মার ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী হামলা চালান। পরে আরও দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সব মিলিয়ে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, কাউকে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; হামলা বা গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ছাত্রনেতাদের বক্তব্য
ছাত্র অধিকার পরিষদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ অভিযোগ করেন, আম্মারকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক সংঘাত ও ‘মব’ তৈরির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর বিচার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও দায় নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ফুয়াদ রাতুলও সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা দাবি করেছেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতির অংশ হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনা ক্যাম্পাসে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আম্মার ও শিবিরের অবস্থান
সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, পোষ্য কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রেললাইন অবরোধ—তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই হয়েছে। তার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ ছিল না। গ্রন্থাগারে হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, এর আগে রাকসু ভবনে তাদের ওপর হামলার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল এবং তার প্রতিক্রিয়াতেই তিনি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
অন্যদিকে, আম্মারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। তার বক্তব্য, আম্মার শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে তিনি সংগঠনটির প্যানেল থেকে রাকসু নির্বাচনে অংশ নিতেন। ফলে আম্মারের কর্মকাণ্ডের দায় শিবির নেবে না।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলীম জানিয়েছেন, সোমবারের ঘটনা এবং এ ধরনের অন্যান্য ঘটনায় যারা জড়িত, তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের বড় প্রশ্ন এখন একটাই—তদন্তের পর এবার কি সত্যিই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? কারণ, আম্মারের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, সেসব তদন্তের ফলাফল বা সুস্পষ্ট শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সাধারণের সামনে দৃশ্যমান হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ঘিরে এ ধরনের ধারাবাহিক অভিযোগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। মতপ্রকাশ, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান—সবই গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে হেনস্তা, হামলা, ভয় দেখানো বা প্রশাসনিক কাজে বেআইনি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে পক্ষেরই হোন না কেন, প্রমাণের ভিত্তিতে আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পারে ক্যাম্পাসে আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।
মন্তব্য