অধ্যাপক ড. মীজান রহমান
জন্ম: ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ | মৃত্যু: ৫ জানুয়ারি ২০১৫
গণিতের জটিল সূত্রে যাঁর ছিল অবাধ বিচরণ, সাহিত্যের শব্দমালায় যাঁর ছিল গভীর অনুরাগ, আর দর্শন ও যুক্তিবাদী চিন্তায় যিনি খুঁজে ফিরেছেন জীবনের সত্য—তিনি প্রখ্যাত বাংলাদেশি-কানাডীয় গণিতবিদ, লেখক ও মুক্তচিন্তক অধ্যাপক ড. মীজান রহমান।
১৯৩২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এই অসাধারণ মেধাবী মানুষটি। গণিতের গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করলেও তাঁর মননজগৎ কেবল সংখ্যাতত্ত্ব ও গাণিতিক সূত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানমনস্কতা, সংশয়বাদ, মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদ—বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চায় তিনি ছিলেন সমান আগ্রহী। তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে জ্ঞানসাধনা এবং মানবিক বোধের এক অনন্য সমন্বয়।
শিক্ষাজীবন ও গণিতচর্চা
ড. মীজান রহমানের শিক্ষাজীবনের সূচনা ও বিকাশ ঘটে বাংলাদেশের মাটিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি এবং ১৯৫৪ সালে ফলিত গণিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। ১৯৫৮ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে বিএ এবং ১৯৬৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬২ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ব্রান্সউইকে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল প্লাজমার গতিতত্ত্ব, যেখানে তিনি সিঙ্গুলার ইন্টিগ্রাল ইকুয়েশন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
পিএইচডি অর্জনের পর তিনি কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ডিস্টিংগুইশড রিসার্চ প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে সম্মানিত হন।
গণিতের জগতে অসামান্য অবদান
ড. মীজান রহমানের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল বিশেষ ফাংশন, বেসিক হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ এবং অর্থোগোনাল বহুপদী। বিশেষত q-series ও সংশ্লিষ্ট গাণিতিক বিষয়গুলোতে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক গণিতজগতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
প্রখ্যাত গণিতবিদ জর্জ গ্যাসপারের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন Basic Hypergeometric Series। ১৯৯০ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য গ্রন্থে পরিণত হয়। ২০০৪ সালে এর পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
গণিতের এই জটিল শাখায় গবেষণা ও উচ্চতর অধ্যয়নের জন্য বইটি বহুল ব্যবহৃত হয়। তাত্ত্বিক গণিতের কঠিন বিষয়গুলোকে সুসংবদ্ধভাবে উপস্থাপন করে তিনি বিশ্বজুড়ে গবেষকদের জন্য জ্ঞানচর্চার একটি সমৃদ্ধ পথ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গণিতবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, গবেষণা প্রবন্ধ পর্যালোচনা এবং বিশেষায়িত কর্মশালা আয়োজনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
গণিতবিদের অন্তরে সাহিত্যিক ও মুক্তচিন্তক
ড. মীজান রহমানের ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর সাহিত্যপ্রীতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা। গণিতের কঠোর যুক্তি ও বিমূর্ত চিন্তার পাশাপাশি তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন।
বাংলা ভাষায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশটি বলে বিভিন্ন জীবনীসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে— তীর্থ আমার গ্রাম, লাল নদী, অ্যালবাম, প্রসঙ্গ নারী, অনন্যা আমার দেশ, আনন্দ নিকেতন, দুর্যোগের পূর্বাভাস, শুধু মাটি নয়, ভাবনার আত্মকথন এবং শূন্য।
তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি উঠে এসেছে সমাজ ও সময়ের নানা প্রসঙ্গ, মানুষের জীবনবোধ, যুক্তি ও দর্শনের অনুসন্ধান। বিজ্ঞানমনস্কতা ও মুক্তচিন্তার প্রতি তাঁর অনুরাগ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার এক বৌদ্ধিক পরিসরে।
তিনি মুক্তমনা লেখালেখি ও অনলাইন আলোচনায়ও সক্রিয় ছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানমনস্কতা, সংশয়বাদ, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসারে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
গণিত ও সাহিত্য—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে বিভিন্ন সম্মাননায়। কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার জন্য তিনি একাধিক স্কলারলি অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং শিক্ষকতা পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে অটোয়া থেকে বাংলাদেশ পাবলিকেশন্সের অ্যাওয়ার্ড অব এক্সেলেন্স এবং ১৯৯৮ সালে পাঠক-নির্বাচিত লেখক হিসেবে দেশ বিদেশ পুরস্কার লাভ করেন। উত্তর আমেরিকায় বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০২ সালে বঙ্গ সম্মেলনের সম্মাননাও পান।
বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো হিসেবেও তিনি স্বীকৃত ছিলেন। তাঁর অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; তা প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার এক অনুপ্রেরণাময় দৃষ্টান্ত।
চিরবিদায়
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি কানাডার অটোয়ায় ৮২ বছর বয়সে এই বরেণ্য গণিতবিদ ও লেখকের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার জন্য দান করে যান—জ্ঞান ও মানবকল্যাণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন।
ড. মীজান রহমানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞানচর্চার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। একজন মানুষ একই সঙ্গে গণিতের গভীরতম সূত্র অনুসন্ধান করতে পারেন, সাহিত্যের সৌন্দর্যে আপ্লুত হতে পারেন, দর্শনের প্রশ্নে নিমগ্ন হতে পারেন এবং যুক্তির আলোয় সমাজ ও জীবনকে বিচার করতে পারেন।
তিনি ছিলেন এমন এক মনীষী, যাঁর কাছে গণিত ছিল চিন্তার শৃঙ্খলা, সাহিত্য ছিল অনুভবের বিস্তার, আর মুক্তচিন্তা ছিল সত্য অনুসন্ধানের সাহস।
আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই প্রজ্ঞাবান মানুষটিকে। তাঁর গবেষণা, সাহিত্যকর্ম ও যুক্তিবাদী চিন্তার উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান, মনন ও মানবিকতার পথে অনুপ্রাণিত করুক।
ড. মীজান রহমান—আপনার জ্ঞানসাধনা ও সৃজনশীলতার আলো আমাদের বৌদ্ধিক জগতে চিরভাস্বর হয়ে থাকুক।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি।


