খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪৯ পিএম
বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে কিছু মানুষ নক্ষত্রের মতো আবির্ভূত হন—অল্প আলোয়ও যাঁরা দীর্ঘদিন পথ দেখান। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তেমনই এক অনন্য কথাশিল্পী। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক মনন, অস্তিত্বচেতনা, সমাজবাস্তবতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্তর্লীন সংকটকে তিনি যে শিল্পশক্তি ও স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন, তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কথাসাহিত্যিকে পরিণত করেছে।
তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং কূটনীতিক। কর্মসূত্রে জীবনের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটালেও তাঁর সাহিত্যজুড়ে ছিল বাংলার মাটি, মানুষ, গ্রামীণ সমাজ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংকট, কুসংস্কার এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে। তাঁর পিতা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। পিতার চাকরির সুবাদে শৈশব-কৈশোরে তৎকালীন পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ তাঁর হয়েছিল। সেই বিচিত্র জনজীবন ও সমাজ-অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।
ছাত্রজীবনেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের প্রকাশ ঘটে। ফেনী হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি হাতে লেখা সাহিত্যপত্র ‘ভোরের আলো’ সম্পাদনা করতেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’, যা ঢাকা কলেজ থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। সেই ‘আলোর ঝলকানি’ যেন বাংলা সাহিত্যে তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিশীল যাত্রারই এক প্রতীকী সূচনা।
‘লালসালু’—এক চিরকালীন আয়না
১৯৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’ তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী আসন এনে দেয়। মজিদ চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসে ধর্মবিশ্বাসের আড়ালে ভণ্ডামি, কুসংস্কার, ধর্মব্যবসা এবং মানুষের সরল বিশ্বাসকে শোষণের নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের মনোজগৎ ও সামাজিক বাস্তবতার যে গভীর পাঠ তিনি দিয়েছেন, তা আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।
‘লালসালু’ পরবর্তীকালে ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয় এবং ১৯৬৭ সালে ইংরেজিতে Tree Without Roots নামে প্রকাশিত হয়। ফলে তাঁর সাহিত্য দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও পৌঁছে যায়।
এরপর প্রকাশিত হয় ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮)। বিশেষত ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’-তে চেতনাপ্রবাহ, অস্তিত্ববাদ, ব্যক্তিমানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার যে শিল্পরূপ তিনি নির্মাণ করেছেন, তা বাংলা উপন্যাসকে আধুনিকতার এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়।
‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের একটি তীক্ষ্ণ উচ্চারণ—
«“তহবিল তছরুপ করেছে এমন অভিযোগে যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না, সে আবার অধার্মিকতার অভিযোগে গভীরভাবে আহত হয়।”»
এই বাক্য শুধু একটি উপন্যাসের সংলাপ নয়; এটি আমাদের সমাজের দ্বিচারিতা, নৈতিকতার ভণ্ড মাপকাঠি এবং সুবিধাবাদী মানসিকতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু এই প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা আজও ফুরিয়ে যায়নি।
গল্প, নাটক ও বহুমাত্রিক সৃজন
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ শুধু উপন্যাসেই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেননি। তাঁর গল্পেও মানুষের জীবন, নিঃসঙ্গতা, ক্ষুধা, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় ভণ্ডামি ও অস্তিত্বের সংকট বারবার ফিরে এসেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নয়নচারা’ (১৯৫১) এবং ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’। নাট্যসাহিত্যে তিনি রচনা করেছেন ‘বহিপীর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’ ও ‘সুরঙ্গ’। তাঁর রচনার বিষয় ও নির্মাণশৈলী প্রমাণ করে—তিনি প্রচলিত ধারার অনুসারী ছিলেন না; বরং নিজেই সৃষ্টি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক ভূগোল।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও স্বদেশের পাশে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিদেশে অবস্থান করেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীন দেশের মাটিতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল; কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই প্যারিসে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। প্যারিসের উপকণ্ঠে মদোঁ-স্যুর-বেলভ্যুতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
সম্মান ও স্বীকৃতি
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন—
– ১৯৫৫ — PEN Prize, ‘বহিপীর’-এর জন্য
– ১৯৬১ — বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, উপন্যাসে
– ১৯৬৫ — আদমজী পুরস্কার
– মরণোত্তর একুশে পদক — ১৯৮৪
তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে বাংলা একাডেমি ২০১৪ সালে প্রবাসী বাঙালি লেখকদের সম্মান জানাতে ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার’ প্রবর্তন করে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি
উপন্যাস:
‘লালসালু’, ‘চাঁদের অমাবস্যা’, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’
গল্পগ্রন্থ:
‘নয়নচারা’, ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’
নাটক:
‘বহিপীর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’, ‘সুরঙ্গ’
ইংরেজি অনুবাদ:
The Tree Without Roots — ‘লালসালু’-এর ইংরেজি রূপ।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য আমাদের শুধু গল্প বলে না—আমাদের নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তিনি প্রশ্ন করেন বিশ্বাসের নামে আমরা কী করছি, ধর্মের নামে মানুষকে কীভাবে ব্যবহার করছি, সমাজের ভেতরে কতটা অন্ধকার জমে আছে, আর সেই অন্ধকারের মধ্যেও মানুষ কতটা আলো খুঁজে ফিরছে।
১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট যে মানুষটি জন্মেছিলেন, ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর দেহ থেমে গেলেও তাঁর কলম থামেনি।
‘লালসালু’র মজিদ, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র অন্তর্দহন, ‘চাঁদের অমাবস্যা’র অস্তিত্বসংকট—সব মিলিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আজও আমাদের সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এক জীবন্ত উপস্থিতি।
তিনি চলে গেছেন বহু বছর আগে।
কিন্তু তাঁর লেখা আজও প্রশ্ন তোলে,
আজও অস্বস্তিতে ফেলে,
আজও অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ—
আলোর ঝলকানি হয়ে জ্বলে ওঠে।
অমর কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
মন্তব্য